আলিউলের সেঞ্চুরি না পাওয়ার হতাশা ও প্রথম সেঞ্চুরিয়ান সদরুলের কথা

আলিউলের সেঞ্চুরি না পাওয়ার হতাশা ও প্রথম সেঞ্চুরিয়ান সদরুলের কথা

প্রয়াত ক্রিকেটার আলিউল ইসলাম নিজেকে খানিক দুর্ভাগা ভাবতেই পারেন। ভাগ্যকে দোষারোপের পাশাপাশি হয়তো একটা অন্যরকম হতাশা আর দুঃখবোধ নিয়েই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন আলিউল। ভেতরে একটা অস্ফুট যন্ত্রণা আর না পাওয়ার কষ্ট নিয়েই চলে গেছেন ওপারে।

ভাবছেন, কে এই আলিউল ইসলাম? তার অষ্ফুট যন্ত্রণাটাই বা কী? এ প্রজন্মের তাকে চেনার কথা নয়। কারণ আলিউল ইসলাম ছিলেন ষাটের দশকের ক্রিকেটার। খেলা ছেড়েছেন ৩৮-৪০ বছর আগে। জাতীয় দলে খেললে হয়তো কোনো না কোনোভাবে তার নামটা আরও বেশি করে উচ্চারিত হতো।

কিন্তু আলিউল ইসলামের জাতীয় দলে খেলা হয়নি কখনও। তার খেলার মতো পর্যাপ্ত মেধা ও সামর্থ্য ছিল কি ছিল না- তা নিয়ে ছোটখাট একটা আলোচনা হতেই পারে। তবে তিনি যে ঘরোয়া ক্রিকেটে দেশের সবসময়ের অন্যতম মেধাবি, বুদ্ধিমান ও তীক্ষ্ণ ক্রিকেট বুদ্ধিসম্পন্ন অধিনায়ক ছিলেন, তা নিয়ে সংশয় নেই কারোর।

সত্তরের দশকে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে অংশ নেয়া যে কোন ক্রিকেটারকে ওই সময়ের সেরা, বিচক্ষণ ও দক্ষ অধিনায়ককে বেছে নিতে বললে বেশিরভাগই বলতেন আলিউল ইসলামের নাম। সবচেয়ে বড় কথা, স্বাধীনতার পর যে ক্লাবটি ফুটবল ও হকির পাশাপাশি ক্রিকেটেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, সেই জনপ্রিয় ক্লাব আবাহনীর প্রথম ক্রিকেট অধিনায়কও ছিলেন আলিউল ইসলাম।

কিন্তু সেটা এ লেখার উপজীব্য নয়। আসল কথা হলো, আলিউল ইসলামই হতে পারতেন ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান। তাও কোন মাঝারি শক্তির বিপক্ষে নয়। আরেক জনপ্রিয় ও বড় দলের তকমাধারি এবং আবাহনীর চির প্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডানের বিপক্ষে।

সেটা ১৯৭৪-১৯৭৫ সালের ঘটনা। আলিউল ইসলাম মোহামেডান-আবাহনী দ্বৈরথে ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষ বোলারদের শাসন করে শতরানের খুব কাছে গিয়েও তা করতে পারেননি। খেলাটি ছিল তিনদিনের। ম্যাচ কন্ডিশন ছিল আবাহনী ৩০০ রানের টার্গেট তাড়া করে চতুর্থ ইনিংস ব্যাট করছিল। আলিউল ইসলামের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়েই আবাহনী শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় জয়ের লক্ষ্যে। আবাহনী অধিনায়ক আলিউল ইসলাম অপরাজিত থেকে যান ৯৯ রানেই।

ভাবছেন, দল জিতে গিয়েছিল। আলিউল ইসলাম হয়তো অন্যপ্রান্তে নটআউট ছিলেন। ব্যাপারটা তেমন নয়। আলিউল ইসলাম নটআউটই ছিলেন ঠিকই। তবে অনেকেরই মত, প্রতিপক্ষ মোহামেডান ক্রিকেটাররা বিশেষ করে একজন ইচ্ছে করেই ওই ম্যাচে আলিউল ইসলামকে সেঞ্চুরি করতে দেননি।

যার বিপক্ষে সেই অভিযোগের তীর তিনিও একজন নামকরা ক্রিকেটার। জাতীয় দলে খেলেছেন, প্রধান নির্বাচকও ছিলেন। সেই ম্যাচ দর্শক হিসেবে দেখেছেন এমন অন্তত চার-পাঁচজন সাবেক ক্রিকেটার জাগো নিউজের এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, আলিউল ইসলাম যখন ৯৯ রানে অপরাজিত, তখন আবাহনীর জয়ের জন্য দরকার ছিল ৪ রান। মোহামেডানের এক স্পিনারের বল একটু বেশি লাফিয়ে উইরকটরক্ষকের গ্লাভসকে ফাঁকি দিয়ে চলে যায় থার্ড ম্যান সীমানার খুব কাছে। স্লিপ থেকে দৌড়ে আসা মোহামেডানের তারকা ক্রিকেটার মাইনুল হক মাইনু একটু সজাগ ও তৎপর থাকলেই সে বল থামাতে পারতেন।

কিন্তু তিনি তা করেননি। অনেকেরই অভিযোগ মাইনুল হক মাইনু বলকে ইচ্ছাকৃতভাবেই যেতে দিয়েছেন সীমানার ওপারে। বল সীমানার রশি ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিতে যায় আবাহনী। আলিউল ৯৯ রানেই অপরাজিত থেকে যান। না হয় আলিউল ইসলামই হতে পারতেন ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান। যেভাবেই হোক না কেন, তার আর ঢাকা লিগের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে ইতিহাস গড়া হয়নি।

এখন কঠিন সত্য হলো, আলিউল ইসলাম ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান নন। তাহলে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে, ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে প্রথম শতরানের কৃতিত্বের অধিকারী কে? কোন ব্যাটসম্যানের ব্যাট থেকে এসেছিল ক্লাব ক্রিকেটের প্রথম সেঞ্চুরি এবং সেটা কোন লিগে, কার বিপক্ষে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খেতে হয়েছে। কারণ ঢাকা তথা বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রাচীন তথ্য-উপাত্ত সেভাবে সংরক্ষিত নেই। দেশের ক্রিকেটের কোন আর্কাইভ নেই। বোর্ডের একটি ওয়েবসাইট থাকলেও, তাতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম দিকের ইতিহাস-পরিসংখ্যান কিছুই নেই। আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটগুলো প্রথা মেনে মূলত, ওয়ানডে-টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পরের বাংলাদেশকে অনুসরণ করেছে। কিন্তু সত্তর-আশির দশকের ক্লাব ক্রিকেটের কোন তথ্যই সেখানে নেই, থাকার কথাও নয়।

এই অবস্থায় ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান কে, তা খুঁজে বের করা খুব কঠিন। অবশেষে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক নাজমুল আমিন কিরন। এ নিবেদিতপ্রাণ খেলাপ্রেমী দেশের ফুটবল, ক্রিকেট, হকিসহ ক্রীড়াঙ্গনের নানা তথ্য, ইতিহাস, পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করেন। বাংলাদেশের খেলাধুলার অনেক ইতিহাস, পরিসখ্যান নাজমুল আমিন কিরনের কাছে অতি যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।

এ অগ্রজ প্রতিম সাংবাদিকের কাছে বিভিন্ন পত্রিকার বিশেষ বিশেষ ম্যাচ, দিন ও ঘটনার পেপার কাটিং রয়েছে। তিনি তা অতিযত্নে রেখে দিয়েছেন। কারও কোন বিশেষ তথ্য উপাত্তের প্রয়োজন পড়লে তিনি তা জানিয়ে দেন।

জাগো নিউজের কাছ থেকে ফোন পেয়ে সেই সময়ের পেপার কাটিং ঘেটে নাজমুল আমিন কিরন জানালেন, ‘ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরিটি সদরুল আনামের। তিনি ১৯৭৫ সালে মোহামেডানের পক্ষে সে সময়ের সিনিয়র ডিভিশন ক্রিকেট লিগের মাঝারি শক্তি ইগলেটসের বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি হাঁকান। সদরুল আনাম ১০৪ রানে অপরাজিত ছিলেন।’

কে এই সদরুল আনাম?

আবারও বলতে হচ্ছে সদরুল আনামও এখনকার ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ উৎসাহী তরুণ প্রজন্মর কাছে মোটেও পরিচিত নাম নন। তাই বলে অখ্যাত কেউও নন। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে দক্ষ ও ভাল ক্রিকেটারের তালিকায় সদরুল আনামের নাম আছে। তার গায়ে আছে সাবেক জাতীয় ক্রিকেটারের তকমা। ১৯৮২ সালে আইসিসি ট্রফিতে খেলেছেন টিম বাংলাদেশের হয়ে।

মূলত অলরাউন্ডার ছিলেন সদরুল। প্রথমত মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান, পাশাপাশি সিম বোলিংও করতেন। ১৯৭৫ সালে মোহামেডানের হয়ে ইগলেটসের বিপক্ষে শতরান করে ঢাকা লিগের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন তখনকার উদ্যমী তরুণ সদরুল আনাম। মোহামেডান তখন মোস্তাফিজুর রহমান সেলিম, দৌলতুজ্জামান আর মাইনুল হক মাইনু প্রমুখ নামি ক্রিকেটারে সাজানো দল।

তখনকার তরুণ সদরুল আনামের ক্যারিয়ার পূর্ণতা পায় আরও পরে বিমানে নাম লিখিয়ে। সত্তর দশকের শেষ দিকে সিনিয়র ডিভিশন ক্রিকেট লিগ খেলতে শুরু করে বাংলাদেশ বিমান। শুরুর পর যত সময় গড়িয়েছে, ততই অনেক দেশবরেণ্য ক্রিকেটারের ঠিকানা হয়েছে বিমান।

পরবর্তীতে বিমানের অধিনায়কত্ব করেছেন সদরুল। যথেষ্ঠ ভাল পারফরমও করেছেন। বিমানের পক্ষেও তার ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে শতরান আছে। বিমানের হয়ে অন্তত ১০ বছর খেলেছেন। পরে বিমানের কোচও ছিলেন কয়েক মৌসুম। কর্মজীবনেও বিমানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সদরুল আনামের নাম। প্যারিসে বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজারের মতো উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি।

Zaheer

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান জহির

৪৫ বছর আগের ঘটনা। তাই ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে সদরুল আনামের নাম দেখে কেউ কেউ আবার আহসান জহিরের নামও উল্লেখ করতে পারেন। বলতে পারেন, এত কাল জানা ছিল দেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হলেন আহসান জহির। তা হলে সদরুল আনামের নাম উচ্চারিত হচ্ছে কেন? তা নিয়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিভ্রান্তির উদ্রেকও ঘটতে পারে।

তাই বলে রাখা ভাল, প্রয়াত আহসান জহির হলেন বাংলাদেশের স্বীকৃত সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট আসরে প্রথম শতরানকারী ব্যাটসম্যান। তবে জহিরের সেঞ্চুরির সঙ্গে ঢাকা লিগকে এক করে ফেললেই সমস্যা। সোজা কথা, আহসান জহির ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান। সেটা ১৯৭৪ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে।

সদরুল আনাম হলেন ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের প্রথম শতরানকারী। দুটি ভিন্ন আসর, ভিন্ন মর্যাদা এবং সময়কালেও আছে পার্থক্য। আহসান জহির জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের শতরানটি ছিল ১৯৭৪ সালে। আর ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে সদরুল আনামের করা সেঞ্চুরিটি হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। তখন প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট আসরের নাম ছিল ‘জাতীয় ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপ।’ আর সেই প্রতিযোগিতার প্রথম আসরেই শতরানের ইনিংস খেলে বাজিমাত করেন জহির। সেটা ১৯৭৪ সালের ঘটনা।

এখন বিভাগীয় দলগুলোকে নিয়ে যেটা জাতীয় লিগ, হয় তখন সেটা হতো সব জেলা দলগুলোকে নিয়ে। বলে রাখা ভাল, তখন বাংলাদেশে জেলা ছিল ১৯টি। সব জেলার অংশগ্রহণে যে ক্রিকেট আসর হতো, তারই নাম ছিল জাতীয় ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপ। ১৯৭৪ সালে সে আসরের ফাইনালে ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম) বরিশালের হয়ে কুমিল্লার বিপক্ষে কুমিল্লার বিপক্ষে ঠিক ১০০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন জহির। সেটাই বাংলাদেশের কোন স্বীকৃত ও জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেট আসরে প্রথম শতরান।

কাজেই প্রয়াত আহসান জহিরের নামটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এখন দেশের ক্রিকেটাররা জাতীয় লিগ আর বিসিএলে গন্ডায় গন্ডায় সেঞ্চুরি করছেন। সেঞ্চুরি হচ্ছে প্রায় খেলাতেই। ডাবল সেঞ্চুরির দেখাও মিলছে বেশ। ট্রিপল সেঞ্চুরিও হয়ে গেছে দুইটি।

কিন্তু প্রথম জাতীয় ক্রিকেট আসরে বরিশালের পক্ষে খেলতে নেমে ক্রীড়াকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শতরান করে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নিজের নামকে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখেছেন আহসান জহির। দেশের ক্রিকেট যতদিন থাকবে, তার নামও ততদিন থাকবে। উচ্চারিত হবে সাধারণ অনুরাগী আর পরিসংখ্যানবিদ, ইতিহাসবিদদের খাতায়।

এআরবি/এসএএস/পিআর