ওয়েবসাইট তৈরি করতে হলে বেসিক যে বিষয়গুলো আপনাকে জানতেই হবে

  • 1.7K
    Shares

একটি ওয়েবসাইটের মালিক হতে বা ওয়েবসাইট পরিচালনা করতে আপনাকে কোন “ওয়েব ডিজাইন কোর্স” করে ওয়েব ডিজাইনার হতে হবে না। তবে আপনি যদি আপনার প্রতিষ্ঠানের পরিচয় সম্বলিত কর্পোরেট ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে আপনার পণ্য বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ই-কমার্স সাইট তৈরি করতে চান অথবা কোন বিশেষ কাজে বা বিশেষ তথ্য প্রচারে বিশেষায়িত ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান তাহলে “বেসিক” কিছু বিষয় আপনাকে অবশ্যই ভালমত জানতে হবে। যদি আপনি তা না জানেন, তবে আপনার ওয়েবসাইটের মালিকানা যে কোন মুহূর্তেই হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে এছাড়া হ্যাকও হতে পারে আপনার মূল্যবান ওয়েবসাইটি।

এই লেখায় আমি চেষ্টা করব প্রতিটা বিষয় ধাপে ধাপে আলোচনা করার।

প্রথমেই জেনে নেই ডোমেইন কি?
আসুন, আমরা বেশ কিছু ডোমেইনের নমুনা দেখিঃ
facebook.com
yahoo.com
google.com

ডোমেইন-ই আপনার প্রাথমিক ঠিকানা। এটাই আপনার ওয়েবসাইটের প্রথম পরিচিতি। ইন্টারনেটে আপনার ডোমেইন ঠিকানা ব্যবহার করেই ভিজিটররা আপনাকে খুঁজে পাবে। আপনি এটাকে কল্পনা করে নিন মোবাইল নম্বর বা আপনার ব্যাংক একাউন্টের নম্বরের সাথে। ধরুন আপনার সাথে রাস্তায় একজন ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হল এখন আপনি তার সাথে পরে আবার যোগাযোগ করতে ইচ্ছুক কিন্তু আপনি তার সাথে কিভাবে যোগাযোগ করবেন? অবশ্যয়ী আপনার কাছে সেই ভদ্রলোকের একটা যোগাযোগ মাধ্যম থাকতে হবে? সেটা হক মোবাইল নাম্বার অথবা যেকোন সোশ্যাল মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার অথবা হোয়াটসাপ। এই যে মোবাইল নাম্বার, ফেসবুক, টুইটার অথবা হোয়াটসাপ এটাই হলো সেই ভদ্রলোকের সাথে যোগাযোগ করার ঠিকানা। Internet Corporation for Assigned Names and Numbers (ICANN) নামে একটি প্রতিষ্ঠান যেসব ডোমেইন ঠিকানার সাথে .com, .biz. .info, .name, .net, .org এক্সটিনশন ইত্যাদি রয়েছে সেই সকল ডোমেইন ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত। তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাৎসরিক ভিত্তিতে ডোমেইন বিক্রি করে থাকে। যেমন, Bluehost, Godaddy, Namecheap, Namesilo ও InterServer ইত্যাদি। আর আপনি যদি বাংলাদেশি .bd এক্সটিনশন ডোমেইন কিনতে চান তাহলে আপনাকে যেতে হবে BTCL এর ওয়েবসাইটে। বাংলাদেশি .bd এক্সটিনশন ডোমেইন বিক্রি করেন সরকারি প্রতিষ্ঠান BTCL। আপনি কি আপনার প্রতিষ্ঠানের ওয়েব এড্রেস (বা টেকনিক্যাল ভাষায় ডোমেইন) কি হবে তা ভেবে রেখেছেন? ডোমেইন অবশ্যই খালি থাকতে হবে। আপনার মোবাইল নম্বর যেমন দ্বিতীয় কারো কাছে নাই, ঠিক তেমনি ডোমেইন কেউ একজন রেজিস্ট্রেশন করে ফেললে তা অন্য কেউ আর কিনতে বা ব্যবহার করতে পারবে না। কিভাবে জানবেন আপনার পছন্দ করা ডোমেইন নাম টি খালি আছে কিনা তা একটু পরেই এই লেখাতেই জানবেন …

এবার আসুন হোস্টিং কি?
এবার আসুন আমরা হোস্টিং সম্পর্কে জেনে নিই। আপনি একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে বিভিন্ন ছবি, লেখা, ভিডিও ইত্যাদি দেখতে পাবেন। আপনি আপনার ওয়েবসাইটে-ও স্বাভাবিকভাবেই আপনার প্রতিষ্ঠানের ছবি, লেখা, ভিডিও ইত্যাদি রাখবেন। ইন্টারনেটে এই ছবি, লেখা, ভিডিও ইত্যাদি রাখার জন্য স্পেস বা মেমোরি প্রয়োজন। আর এই মেমোরি বা স্পেস্কেই হোস্টিং বলা হয়। এই হোস্টিং স্পেস ১ গিগাবাইট-ও হতে পারে, ৫০০ গিগাবাইট-ও হতে পারে, আবার আনলিমিটেড-ও হতে পারে। ঠিক যেমন আপনি একটি গোডাউনে আপনার মাল রাখার জন্য স্পেস ভাড়া নিলেন – আপনি যতটুকু স্পেস ভাড়া নিবেন, আপনি ঠিক ততটুকুতেই আপনার মালপত্র রাখতে পারবেন। সাধারণ মানের ওয়েবসাইটের জন্য ১ গিগাবাইট যথেষ্ট, তবে সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট হলে যাতে প্রতিদিন নতুন তথ্য ইনপুট করতে হয়, তার জন্য প্রচুর হোস্টিং স্পেস লাগবে। আরেকটি বিষয়, হোস্টিং এর সাথে ব্যান্ডউইথ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এক্ষেত্রে ব্যান্ডউইথ বলতে আপনার ওয়েবসাইট প্রতিমাসে কতজন ভিজিটর দেখতে পারবেন – তার ক্ষমতাকে বোঝায়। সাধারণ ওয়েবসাইটের জন্য মাসে ১০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ যথেষ্ট। মাসিক ব্যান্ডউইথ শেষ হয়ে গেলে কোন ভিজিটর ওয়েবসাইট দেখতে চাইলে তখন হয় সাদা পৃষ্ঠা বা “Account Suspended” এই ধরনের কিছু লেখা দেখবে। বিশ্বসেরা প্রযুক্তি কোম্পানি (যেমন- ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফট, ইয়াহু ইত্যাদি) নিজেদের অফিস বিল্ডিঙেই হোস্টিং সার্ভার স্থাপন করে। (ঠিক যেন গোডাউন স্থাপন করে।) এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তবে আপনার আমার মত সাধারণ মানুষ, ছোট বা মাঝারি আকৃতির প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা সম্ভব না। এক্ষেত্রে কোন হোস্টিং সার্ভিস প্রভাইডারের থেকে “ডোমেইন ও হোস্টিং” কিনতে হবে। এবার আসুন জানি, সঠিক বিজনেস পার্টনার হিসাবে হোস্টিং সার্ভিস প্রোভাইডারকে চিনব কিভাবে? কে বিশ্বস্ত? কে ভাল সার্ভিস দেয়?

ডোমেইন ও হোস্টিং কিনব কিভাবে?
বাস্তবে ডোমেইন ও হোস্টিং বিক্রি করে অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান, তবে বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক রিসেলার, বা রিসেলারের রিসেলার, বা রিসেলারের রিসেলারের রিসেলার আছে। বাংলাদেশে ডোমেইন ও হোস্টিং বিক্রি (মূলত রিসেল) করে এই ধরনের প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠান খুব কম আছে। বেশিরভাগই “আজকে শখের বশে আছি, কালকে আর নাই” টাইপ কোম্পানি – যারা আপনাকে কন্ট্রোল প্যানেল (অর্থাৎ পূর্ন নিয়ন্ত্রণ) দিবে না। প্রতিমাসে ৪/৫ দিন ওয়েবসাইট ডাউন অবস্থায় থাকবে, এই অবস্থায় ফোন দিলে ধরবে না। পরবর্তী বছরের রিনিউ করার জন্য এদের খোঁজার সময় যদি কোন কারনে দেখেন তারা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছে তবে আপনার স্রেফ কপাল পুড়বে, কারন ওয়েবসাইটের ফুল কন্ট্রোল তারা আপনাকে দেয়নি – অর্থাৎ মেয়াদ শেষে আপনার ওয়েবসাইট স্রেফ ইন্টারনেট থেকে মুছে যাবে। তাই কারো ঝাক্কাস ডিজাইনের ওয়েবসাইট দেখে বা পরিচিত কোন বন্ধুর কথায় চক্ষুলজ্জায় এসব থার্ডক্লাস প্রতিষ্ঠানের থেকে ডোমেইন ও হোস্টিং কিনলে ধরা খাবার ব্যপক সম্ভাবনা আছে। ধরুন আপনি কোন দোকান থেকে শার্ট বা শাড়ি কিনলেন, বাসায় আনার পর দেখলেন “রিজেক্ট”! তখন আর পরিবর্তন করতে না পারলে না হয় কয়েক হাজার টাকা লস মেনেই নিলেন। কিন্তু আপনি একটি ওয়েবসাইট এড্রেস আপনার ভিজিটিং কার্ড, লিফলেট, ব্যানার, ফেসবুক এড, টিভি এড সব জায়গায় ব্যবহার করলেন। আচমকা বছর শেষে যদি তা হাতছাড়া হয়ে যায়, তখন যেসব সম্ভাব্য ক্রেতা আপনার ওয়েবসাইট এড্রেস মুখস্ত করে ফেলেছে, তাদের আপনি নতুন এড্রেস জানাবেন কিভাবে?

উল্লেখিত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত হবে আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা। সবচে’ বিশ্বস্ত কারা?

এই সব প্রতিষ্ঠান থেকে কিনতে হলে আপনার অবশ্যই
একটি ইমেইল এড্রেস, এবং আন্তর্জাতিক মাস্টারকার্ড বা পেপল বা পেয়ওনিয়ার একাউন্ট থাকতে হবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাঙ্কে মাস্টারকার্ড ইস্যু করে যার গায়ে লেখা থাকে “Valid only in Bangladesh” – অবশ্যই এটা নয়। আপনি ব্যাংকে বলবেন, “আমি আন্তর্জাতিক ই-কমার্স সাইট থেকে কেনাকাটা করতে আগ্রহী। আমার International MasterCard প্রয়োজন”।

বাংলাদেশি সরকারি প্রতিষ্ঠান BTCL বাংলাদেশের নিজস্ব .bd এক্সটিনশন ডোমেইন বিক্রি করেন তবে তাদের সার্ভার প্রায়ই হ্যাক হয়। তাই এদের সাথে যোগাযোগ না করে সরাসরি উল্লেখিত জনপ্রিয় হোস্টিং সার্ভিস প্রভাইডারের থেকে যেসব ডোমেইন ঠিকানার সাথে .com, .biz. .info, .name, .net, .org এক্সটিনশন ইত্যাদি রয়েছে সেই সকল ডোমেইন কিনুন। বাজেট হয়ত একটু বেশি বা কম-ও হতে পারে। যদি বাজেট একটু বেশি-ও হয় তবু সস্তার তিন অবস্থার চেয়ে ফাউন্ডেশনটা মজবুত করুন। নিরাপত্তা সবার আগে। ডোমেইন সাধারণত বাৎসরিক ১০ ডলার হতে ৪০ ডলার হয়। হোস্টিং সাধারণত বাৎসরিক ৫০ ডলার থেকে ১০০ ডলার হবে। কোন ক্ষেত্রে হোস্টিং নিলে ডোমেইন ফ্রি দিতে পারে, তাতে সমস্যা নাই। তবে কেউ যদি শুধু হোস্টিং ছাড়াই মাত্র ১ ডলারে ডোমেইন বিক্রির অফার দেয়, সেক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম – এরা সাধারণত পরের বছর ঝামেলায় ফেলবে।

কোন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ বা CMS সবচেইয়ে ভাল?
অতীতে প্রায় সব ওয়েবসাইট HTML নামক একটি প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে তৈরি হত। এখন আধুনিক ও প্রফেশনাল অনেক ওয়েবসাইট সমৃদ্ধ অনেক প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে তৈরি। যেমন ফেসবুক PHP দিয়ে তৈরি। (এই ভাষা বা ল্যাঙ্গুয়েজ বাংলা, ইংরেজি, আরবি বা হিন্দির মত ভাষা নয়, এটা কম্পিউটারের জন্য বোধগম্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ভাষা যাকে বলা হয় প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ।) অনেক সময় অনেক ওয়েব ডেভেলপারকে হয়তো বলতে শুনেছেন বা শুনবেন যে তারা আপনার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট PHP দিয়ে নির্মানে আগ্রহী। এই ওয়েব ডেভেলপাররা সাধারণত ফটকাবাজ শ্রেণীর। বড় বড় প্রতিষ্ঠান PHP বা সমতুল্য প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে। যেমন Google এর কর্মী সংখ্যা ৪৯,০০০ মাত্র! এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আই.টি. ডিভিশন আছে, তাদের পক্ষেও সম্ভব PHP ভিত্তিক কিছু করা। কিন্তু আপনি যদি এককালীন ভিত্তিতে কাউকে দিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি করে নিতে আগ্রহী হন, যদি আপনি পরবর্তীততে ছোটখাট আপডেট গুলো নিজেই করতে আগ্রহী হন, তবে PHP নয়, আপনার জন্য বা ছোট বা মাঝারি আকৃতির প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের জন্য সেরা সমাধান হল Content Management System (সংক্ষেপে CMS)।

ফেসবুকে চাকুরীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি-তে অনেক ক্ষেত্রেই উল্লেখ থাকে, PHP তে গ্রাজুয়েশনসহ পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কোর্স নেই, তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুইমাসের কোর্স করায় – প্রশ্ন হল তারা কি পাঁচ বছরের কোর্স শরবতের মত গুলিয়ে স্টুডেন্টকে খাইয়ে দেয়? যারা দুই মাসের কোর্স করে তারা শুধুমাত্র বেসিক ধারনা নেয়। সত্যিকারের দক্ষ যারা আছে, তারা আবার আপনার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করবে না – তারা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত উচ্চ বেতনে কর্মরত – হোক তা বিদেশি বা বাংলাদেশি মালিকানায়, অথবা বিদেশে থেকে হোক বা বাংলাদেশে থেকে হোক। তাই কোন ওয়েব ডেভেলপার যদি আপনার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট PHP দিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়- তবে বুঝতে হবে তিনি হয় “অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী” টাইপ কিছু, নয়ত আপনি যাতে আপনার ওয়েবসাইট কখনোই ঠিকমত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তার ব্যবস্থা পাকাপাকি করতে যাচ্ছেন। উদ্দেশ্য হল, যতবার আপনার ওয়েবসাইট আপডেট করার প্রয়োজন হবে, আপনি যেন ততবার তাকেই মোটা ফীতে পুনরায় হায়ার করতে বাধ্য হন।

তাহলে আমরা আবার পূর্বের আলোচনায় ফেরত আসি! পৃথিবীর সবচে পরিচিত সি.এম.এস. হল WordPress, Joomla, Drupal ইত্যাদি। এর প্রতিটাই অবশ্য PHP দিয়েই তৈরি, কিন্তু সিস্টেমটা এমনভাবে ডেভেলপ করা, যার ফলে আপনি একবার ওয়েবসাইট নির্মান হয়ে গেলে আপনি খুব সহজেই তার তথ্য, ছবি, লিঙ্ক ইত্যাদি আপডেট করতে পারবেন। অর্থাৎ পার্মানেন্টভাবে একজন ওয়েব ডেভেলপার নিয়োগ আর দিতে হবে না। ওয়েবসাইট তৈরি আপনার পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে না, কিন্তু স্বল্প টেকনিক্যাল জ্ঞান নিয়ে আপডেট ও মাইনর পরিবর্তন করতে পারবেন। তো এই উল্লেখিত CMS গুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কোনটি? অবশ্যয়ী সেটা ওয়ার্ডপ্রেস – যা দিয়ে CNN, The Obama Foundation, Katy Perry, Usain Bolt, Georgia State University, TechCrunch, OpenID, Library of Congress ইত্যাদি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয় জনপ্রিয় সি.এম.এস. হল Joomla যা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বেশিরভাগ ওয়েবসাইট তৈরি।

ডোমেইন ও হোস্টিং কেনার সময় কোন প্যাকেজ কিনব ?
WordPress এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের সুপারিশ অনুযায়ী সেরা হোস্টিং সার্ভিস হল BlueHost, dreamhost ও sitegraound কোম্পানি। বাংলাদেশে মোবাইল কোম্পানির যেমন বিভিন্ন প্যাকেজ থাকে; কোনটায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা একই রেট, আবার কোনটায় ১০টা FnF আছে, কিন্তু অন্যান্য নাম্বারে কলরেট বেশী। ঠিক তেমনি প্রত্যেক হোস্টিং সার্ভিস প্রোভাইডারের একাধিক প্যাকেজ আছে। উল্লেখিত ব্লু হোস্টে ওয়ার্ডপ্রেসের জন্য সবচেয়ে সেরা প্যাকেজ হল সেখানে উল্লেখিত Recommended Package । এই লিঙ্কে দেখুনঃ https://1.envato.market/LVQZZ এবং কিনুন। ভুলে যাবেন না, এই “ক্রয়” বাৎসরিক। বছর শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগেই রিনিউ করতে হবে। আরও ভাল হয়, যদি দুই তিন মাস আগেই রিনিউ করেন। শেষ মুহূর্তে যদি অন্যান্য কাজের চাপে ভুলে যান, বা বাজেট ঘাটতি থাকে, আর যদি মিস হয় তাহলে বিশাল ঝামেলায় পরবেন। এই প্যাকেজ কেনার মাধ্যমে আপনার ডোমেইন ও হোস্টিং কেনার প্রক্রিয়া সমাপ্ত হবে! এবার সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুরু করবো। তবে এর মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ক কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি।

পাসওয়ার্ড অত্যন্ত সাবধানে গোপন জায়গায় সেভ করে রাখুন

  • আপনার ইমেইল একাউন্টের ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড (ইতিমধ্যে আপনার তা আছে)
  • ডোমেইন কন্ট্রোল প্যানেলে প্রবেশের ওয়েবএড্রেস, ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড (হোস্টিং সার্ভিস প্রভাইডার আপনাকে দিবে)
  • হোস্টিং কন্ট্রোল প্যানেলে প্রবেশের ওয়েবএড্রেস, ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড (হোস্টিং সার্ভিস প্রভাইডার আপনাকে দিবে)
  • ওয়েবসাইটের তথ্য আপডেট করার জন্য ড্যাশবোর্ডে প্রবেশের ওয়েবএড্রেস, ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড (এটা ওয়েব ডিজাইনার তৈরি করবে)
  • প্রতিটা ডোমেইনের একটা domain’s secret key থাকে, এটা মহা-গোপনীয়। এটা পাসওয়ার্ডের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

হোস্টিং সার্ভিস প্রভাইডার আপনাকে যদি রেডিমেড পাসওয়ার্ড দেয়, তবে আপনি তা অবশ্যই পরিবর্তন করবেন। আপনি ওয়েবসাইট তৈরির জন্য কোন ওয়েব ডিজাইনার নিয়োগ দিলে তাকে শুধুমাত্র হোস্টিং কন্ট্রোল প্যানেলে প্রবেশের ওয়েবএড্রেস, ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড দিবেন, এবং কাজ শেষে পাসওয়ার্ড অবশ্যই পরিবর্তন করবেন। একইভাবে ওয়েবসাইটের ড্যাশবোর্ডের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করবেন। যদি আপনার ওয়েবসাইট হ্যাকারের লক্ষবস্তু হয়, তবে দায়দায়িত্ব আপনার-ই। কারন ওয়েব ডিজাইনার কাজ শেষ করার পর ওয়েবডিজাইনারের দায়িত্ব শেষ। পাসওয়ার্ড নিরাপদে রাখুন, এবং অবশ্যই নিজের জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর বা সহজেই অন্য কেউ অনুমান করতে পারে, এই ধরনের কিছু পাসওয়ার্ড হিসাবে ব্যবহার করবেন না। সবচে ভাল হয়, কী-বোর্ডের CAPITAL LETTER, small letter, Symbol (অর্থাৎ [email protected]#$%^&*), Numeric Digit (অর্থাৎ 1234567890) ইত্যাদি চারটা মিলিয়ে কমপক্ষে ১২ অক্ষরের পাসওয়ার্ড তৈরি করুন। আর যেসব ওয়েবসাইটে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভেরিফিকেশন কোড পাবার সুযোগ আছে, অবশ্যই তা ব্যবহার করুন। আর যেই মোবাইল নাম্বারটা ব্যবহার করবেন, তার সিম যেন নিজের নামেই (বা প্রতিষ্ঠান হলে প্রতিষ্ঠানের নামে বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নামে) রেজিস্ট্রেশন করা থাকে।

দ্বিতীয় ধাপের কাজ- ডিজাইন পছন্দ করুন
সাধারণত উল্লেখিত Content Management System ওয়ার্ডপ্রেসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট WordPress.ORG তে প্রচুর নমুনা ওয়েব ডিজাইন বিনামুল্য পাওয়া যায়, এই ডিজাইন WordPress Theme নামে পরিচিত। যার উপর ভিত্তি করে ওয়েব ডিজাইনার কাজ করবেন। তবে আবারো বলছি, সস্তার তিন অবস্থা। এই বিনামূল্যের সব ডিজাইন-ই “মোটামুটি” মানের। আপনি যদি “চোখ ধাঁধানো” ডিজাইন চান তাহলে Envato ThemeForest থেকেই কিনতে হবে, এটাই ওয়ার্ডপ্রেস থিম সহ বিভিন্ন CMS Theme কেনার জন্য পৃথিবীর ১ নম্বর মার্কেটপ্লেস। আপনি সরাসরি এই লিঙ্কে ThemeForest যেয়ে ওয়েবসাইট ডিজাইন (অর্থাৎ ওয়ার্ডপ্রেস থিম) পছন্দ করুন। প্রয়োজনের ওয়েবসাইটের সার্চবক্সে আপনার ওয়েবসাইট Corporate, eCommerce, Magazine, Blog, Photography কি ধরনের হবে তা লিখে সার্চ দিয়ে পছন্দের একটি ডিজাইন বেছে নিতে পারেন। প্রতিটি থিমের মূল্য 43 USD হতে 75 USD এর মধ্যে পড়বে। তবে এই মূল্য বাৎসরিক নয়, একবার কিনলে সারাজীবন ব্যবহার করতে পারবেন। তবে একটি ক্রয়কৃত থিম শুধুমাত্র একটি ওয়েবসাইটেই আপনি ব্যবহার করতে পারবেন। আপনার কোম্পানির মালিকানা যেমন আপনার, তেমনি আপনার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মালিকানাও আপনার। যত ঝামেলাই হোক, এই প্রথম দুই ধাপের কাজ আপনি নিজেই করুন। এটা অন্য কাউকে দিয়ে করালে, অন্য কারো ইমেইল এড্রেস বা মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে মালিকানা প্রমানে আপনি সমস্যায় পরতে পারেন। ধরুন আপনি প্রবাসী বাংলাদেশি, বাংলাদেশে আপনি গ্রামের অধিবাসী আপন চাচাকে কয়েক বিঘা ধানী জমি কিনে রাখার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা পাঠালেন। আপনি নিজে আসতে পারলেন না, তাই “সাময়িক ভাবে” আপনার চাচার নামেই রেজিস্ট্রি করা হল। পরে তিনি যদি অস্বীকার করেন, আপনি কিন্তু কিছুই করতে পারবেন না। আবার তিনি যদি আপনি ফেরার পূর্বেই মারা যান, আইন অনুযায়ী সম্পত্তির মালিক কিন্তু হবেন আপনার চাচাত ভাইবোনেরা। তাই প্রয়োজনে এক্সপার্ট কাউকে পাশে রাখতে পারেন, তবে কিভাবে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন ও ডোমেইন কী পরিবর্তন করতে হয় – তা খুব ভাল করে জেনে নিবেন, এবং সেই “এক্সপার্ট” চলে যাওয়ার পর আপনি নিজে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করবেন। এমনকি ক্রেডিট কার্ডের বা ডেবিট কার্ডের তথ্য ইনপুট করার সময় সহযোগী এক্সপার্টকে উঠে যেতে বলবেন। এক্ষেত্রে চক্ষুলজ্জার কিছু নেই।

তৃতীয় ধাপের কাজ- ওয়েব ডিজাইনার নিয়োগ
দ্বিতীয় ধাপের কাজ শেষ, এবার তৃতীয় ধাপ – ওয়েব ডিজাইনার নিয়োগ, এটাই শেষ! তবে ওয়েব ডিজাইনার নিয়োগের পূর্বেই কোম্পানির লোগো, হাই কোয়ালিটির ছবি, সমস্ত তথ্য টাইপ করে রেডি রাখুন। লোগো বৃত্তাকার বা চতুর্ভুজ আকৃতি হলে সব’চে ভাল। কারন ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব সব জায়গায় প্রোফাইল পিকচার হয় বৃত্তাকার বা চতুর্ভুজ। আপনার লোগো আয়তক্ষেত্র বা রম্বস হলে মিলান মুশকিল হবে। আর ডিজাইনটা কেমন হবে তার একটি কল্পনা করুন। কত পৃষ্ঠা হবে, কি কি তথ্য থাকবে, সাথে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবে একাউন্ট থাকবে কিনা? সবই যদি আপনি করেন, তাহলে ওয়েব ডিজাইনারের কাজ কি? ধরুন আপনি কাঁচাবাজারে গেলেন, সেখানে মুরগির মাংস, মহিষের মাংস, গরুর মাংস, খাসির মাংস, কোয়েল পাখির মাংস সবই আছে। আপনি কি খাবেন তা আপনার সিদ্ধান্ত। আপনি গরুর মাংস কিনলেন। সাথে প্রয়োজনীয় মসলা, ঘি ইত্যাদি কিনলেন। এনে দিলেন বাবুর্চিকে। আবার দিলেও হবে না। আপনাকে “ইন্সট্রাকশন” দিতে হবে যে আপনি কি ঝোল করে খাবেন, নাকি কাবাব খাবেন, নাকি ভুনা খাবেন, নাকি তেহারি টাইপ কিছু খাবেন! সে উপাদেয় পদ্ধতিতে রান্না করে তা আপনার সামনে পরিবেশন করবে। Envato ThemeForest থেকে কেনা থিমকে আপনি গরুর মাংসের সাথে তুলনা করুন। এই থিম রান্না করা অবস্থায় না, বরং একদম Raw অবস্থায় থাকে। কোম্পানির লোগো, হাই কোয়ালিটির ছবি, টাইপ করা সমস্ত তথ্যকে আপনি মসলা ও ঘিয়ের সাথে তুলনা করুন। বাবুর্চি এরপর যেমন রান্না করবে, তেমনি ওয়েব ডিজাইনার এই Raw Theme ও আপনার দেয়া প্রয়োজনীয় তথ্য (কোম্পানির লোগো, হাই কোয়ালিটির ছবি, টাইপ করা সমস্ত তথ্য, ভিডিও) এবং আপনার ইন্সট্রাকশন (কয় পৃষ্ঠা হবে, কোন অংশে তথ্যটা কিভাবে আসবে) ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে ওয়েবসাইট তৈরি করবে।

ওয়েব ডিজাইনারের পারিশ্রমিক কত?
আপনি চাইলে কোন নামি দামি ওয়েব ডিজাইনার প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিতে পারেন, বা ফ্রিল্যান্সার ওয়েব ডিজাইনারকে নিয়োগ দিতে পারেন। কে কিভাবে সার্ভিস দেয় তা আপনি ঠাণ্ডা মাথায় তাদের সার্ভিসের বর্ণনা তুলনা করে দেখুন। এক্ষেত্রে ওয়েব ডিজাইনের কাজ একবার ডিজাইন করে ওয়েবসাইট আপনাকে হস্তান্তর করা। পরবর্তিতে আপনি যদি ওয়েবসাইটের কোন তথ্য আপডেট করতে চান, তবে আপনাকে হয় নিজেকে করতে হবে বা তাকে নতুনভাবে নিয়োগ করতে হবে।

সাধারণভাবে যেসব ওয়েবসাইট তৈরিতে ডেভেলপারের যা পারিশ্রমিক হয় তার শ্রেণি ও সম্ভাব্য খরচ উল্লেখ করছিঃ

  • কর্পোরেট – ৫,০০০ হতে ৫০,০০০
  • ই কমার্স – ১০,০০০ হতে ২,৫০,০০০
  • অনলাইন ম্যাগাজিন বা অনলাইন নিউজপেপার – ৫,০০০ হতে ২,৫০,০০০
  • ফটোগ্রাফি – ৫,০০০ হতে ৫০,০০০
  • সোশ্যাল নেটওয়ার্ক – ১০,০০০ হতে ২,৫০,০০০

এই খরচের পার্থক্য কেন? আপনি যদি একদম সাদামাটাভাবে করেন, তাহলে খরচ কম হবে, কিন্তু যদি বিভিন্ন ফিচার যোগ করতে বলেন, যেমন

  • ওয়েবসাইটের ঠিকানার সাথে মিলিয়ে ইমেইল ঠিকানা তৈরিঃ যেমন [email protected]
  • সোশ্যাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করার ব্যবস্থা
  • ব্লগ বা লেটেস্ট নিউজ
  • ছবির গ্যালারি (স্লাইড শো সহ)
  • যোগাযোগের জন্য কন্টাক্ট ফর্ম
  • কোন প্রশ্নের মাধ্যমে জনমত জরিপের ব্যবস্থা
  • ফেসবুক, টুইটার, গুগল প্লাস, ইউটিউব, লিঙ্কেদিন প্রোফাইল ও তার লিঙ্ক
  • গুগল ও বিং সার্চ ইঞ্জিনে সংযুক্তি
  • গুগল ম্যাপের মাধ্যমে আপনার অফিস লোকেশন দেখান

বাংলা বা English যে কোন একটি ভাষায়, সাথে নব্বইটির অধিক ভাষায় Google এর মাধ্যমে অনুবাদের ব্যবস্থা। তাহলে ব্যয় অবশ্যই বৃদ্ধি পাবে। আপনার ই-কমার্স সাইটে আপনি ১০টি প্রডাক্ট বিক্রির জন্য ছবি ও তথ্য ওয়েব ডিজাইনারকে দিলেন, তাহলে রেট একরকম। কিন্তু আপনি যদি ২৫০টি প্রডাক্টের জন্য ছবি ও তথ্য ওয়েব ডিজাইনারকে দেন, তাহলে রেট অবশ্যই বেশি হবে।

কতদিন লাগবে? Envato ThemeForest থেকে থিম কিনুন বা ওয়ার্ডপ্রেসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের একটি ফ্রি থিম সম্পর্কে ওয়েব ডিজাইনারকে বলুন। সাথে আপনার বিস্তারিত তথ্য, ছবি, ভিডিও, লোগো ইত্যাদি দিন। আপনার ওয়েবসাইট কয় পৃষ্ঠা, কিরকম হবে জানান। সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনি আপনার ওয়েবসাইট রেডি অবস্থায় পাবেন।