করোনাকালে কোন পথে বাংলাদেশ

যশোরে আরও ১৫ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত
  • 1
    Share

মাসুদ হাসান

গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি চলছে। পাঁচ দফা ছুটি বাড়িয়ে আগামী ৫ মে পর্যন্ত করা হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো সরকার টানা ৪১ দিনের ছুটি ঘোষণা করলো। এই ছুটির উদ্দেশ্য হলো করোনাভাইরাস যেন দেশে মহামারির আকার ধারণ করতে না পারে।

এই ভাইরাস মানুষের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। তাই সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে এই সরকারি ছুটির ঘোষণা। সরকারি ছুটির ফলে দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয় আসবে জানার পরও সরকার ছুটি ঘোষণা করেছে। কারণ সরকার দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়ে দেশের মানুষের জীবনকে বেশি মূল্যবান মনে করেছে।

করোনাভাইরাস যেন ছড়িয়ে যেতে না পারে সেই জন্য বিশ্বের অনেক দেশে এখন লকডাউন চলছে। আমাদের দেশে ছুটি হিসেবে ঘোষণা এলেও এটা কার্যত লকডাউন হিসেবে পরিপালন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই লকডাউন শুরু করেছিল চীন। তারা এতে সাফল্য পায়, আর তাই তাদের অনুসরণ করে অনেক দেশ এই লকডাউন পদ্ধতি বেছে নেয়।

মহামারি থেকে বাঁচার জন্য বিশ্বের অনেক দেশ লকডাউন ঘোষণা করলেও তা সঠিকভাবে পরিপালন করা অনেক দেশের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য লকডাউন শতভাগ বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সত্যিকার অর্থে চীনে যেভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হয়েছে সেভাবে আমাদের দেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। চীন সরকার লকডাউন এলাকায় খাদ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ডোর টু ডোর পৌঁছে দিয়েছে। কাউকে বাসা থেকে বের হতে দেয়নি। লকডাউনের প্রকৃত সার্থকতা এখানেই লুকিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গত এক মাসে যা পরিলক্ষিত হয়েছে তাতে একে লকডাউন বলা যাবে না, একে এক ধরনের অবরোধ বা ছুটি বলা যেতে পারে।

লকডাউনের একটি উদ্দেশ্য থাকে। আর তা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করোনায় আক্রান্তদের শনাক্ত করে তাদের সুস্থ ব্যক্তিদের থেকে আলাদা করে ফেলা। যদি লকডাউন সময়ের মধ্যে এটি সম্ভব না হয় তাহলে দেশ লকডাউনের সুফল পাবে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আক্রান্তের গতি কিছুটা স্তিমিত হলেও, লকডাউন ছাড়ার সাথে সাথে এটি আবার আগের গতিতে ফিরে আসবে। এই ধরনের ছুটি ঘোষণা করে ভাইরাসের গতিকে হয়তো কিছুটা কমিয়ে রাখা যাবে কিন্তু এর ভয়াবহতা কমানো সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৪৩ হাজার ব্যক্তির করোনা টেস্ট করা হয়েছে। প্রতিদিন তিন হাজার করোনা টেস্ট করা হয়। এই গতিতে দেশের ১৮ কোটি মানুষকে করোনা টেস্ট করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। করোনাকাল কতদিন থাকবে সেই বিষয়ে স্পষ্ট করে কারও পক্ষে বলা সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেছে, করোনার এই প্রাদুর্ভাব আরও অনেক দিন থাকবে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে এই লকডাউন কতদিন থাকবে?

বাংলাদেশে প্রায় ১০ কোটি মানুষ আছে যাদের পক্ষে দুই মাসের খাবার একসাথে কেনা সম্ভব না। তাহলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ঘরবন্দি করে বাঁচিয়ে রাখা কি সম্ভব? আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থা ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত নয়। উন্নত দেশগুলোতে ফ্রি শিক্ষা, ফ্রি চিকিৎসা এমনকি বেকারভাতা পর্যন্ত রয়েছে, যা আমাদের দেশে আমরা এখনও কল্পনা করতে পারি না।

দেশের লক্ষ লক্ষ পরিবহন শ্রমিক রয়েছে যারা কাজে না গেলে তাদের জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব না। লক্ষ লক্ষ মুদির দোকানদার রয়েছে যারা দোকান না খুললে তাদের সংসার চালানো সম্ভব নয়। দেশে লক্ষ লক্ষ নির্মাণশ্রমিক রয়েছে যারা কাজে না গেলে তাদের দুই বেলা আহার জোগাড় করা সম্ভব না। শুধু তাই না, যারা প্রাইভেট চাকরি করেন তাদের কোম্পানি বসিয়ে বসিয়ে কতদিন বেতন দেবে সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। কারণ এই মুহূর্তে কোম্পানিগুলোর আয় শূন্য।

উদ্দেশ্যহীন লকডাউন আমাদের সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা থেকে সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। তাছাড়া বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করার ক্ষেত্রে সরকারের অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি এমন হতো দুই মাস কষ্ট করলে এই সমস্যা থেকে বের হওয়া যাবে তাহলে এই কষ্ট মানুষ মেনে নিতে পারত। কিন্তু সমস্যাটা হলো, আমরা জানি না যে, এই সমস্যা কতদিন চলবে।

তাই উদ্দেশ্যহীনভাবে লকডাউন চলতে থাকলে দেশ একটি অন্ধকার গর্ভে হারিয়ে যাবে। সে জন্য এখন থেকেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আস্তে আস্তে সকল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, সমুদ্রবন্দর খুলে দিতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে সশস্ত্রবাহিনীকে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

এই বাস্তবতাগুলো আমরা যত তাড়াতাড়ি মেনে নেব ততই আমাদের জন্য ভালো হবে। মহামারির বিরুদ্ধে টিকে থাকতে গিয়ে অনেক কিছুই বিসর্জন দিতে হয়। আর তাই সেই সকল বিসর্জনকে মেনে নিয়েই আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করতে হবে।

এইচআর/বিএ/পিআর