করোনায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শ কমিটির আট দফা সুপারিশ

করোনায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শ কমিটির আট দফা সুপারিশ
  • 1
    Share

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শ কমিটির দ্বিতীয় সভা ২৮ শে এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বিস্তারিত অফিস আলোচনা ও পূর্ববর্তী সভায় গঠিত পাঁচটি সাব-কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা করে আট দফা সুপারিশ করা হয়।

টেকনিক্যাল কমিটির সভাপতি প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
আট দফা সুপারিশসমূহ নিম্নরুপ-

১। হাসপাতাল সেবার মান বৃদ্ধির বিষয়ে পরামর্শ:
(ক) স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালসমূহকে কোভিড-১৯ এর রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্বাচন করাই যুক্তিযুক্ত ও সমীচীন। হাসপাতালসমূহ মৃদু থেকে মাঝারিভাবে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য রাখা বাঞ্ছনীয়।

(খ) কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য যে হাসপাতালগুলো নিয়োজিত আছে, সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের যথেষ্ট জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ চিকিৎসক থাকতে হবে। স্বাস্থ্য সেবার জন্য নিয়োজিত ওয়ার্ড বয় ও পরিচ্ছন্নকর্মীদের সংখ্যা বাড়িয়ে সেবার মান উন্নত করতে হবে।

(গ) স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য প্রয়োজনীয় পিপিইসহ নির্ধারিত মানসম্মত সুরক্ষা সামগ্রী যথেষ্ট সংখ্যায় সরবরাহ করতে হবে। বিশেষত- যারা মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত ও সংক্রমিত হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকেন তাদের জন্য পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। সুরক্ষা সামগ্রীসমূহ যাতে মান সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি থাকা দরকার।

(ঘ) কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহে রোগী, চিকিৎসক ও অন্যান্য সকলের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য যথেষ্ট সংখ্যক পানি-ফিল্টারের ব্যবস্থা করা দরকার।

(ঙ) কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহে রোগীদের চিকিৎসার জন্য অতি প্রয়োজনীয় টেস্টের ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয় এবং এই সকল পরীক্ষাসমূহ নিশ্চিত করতে হবে। এ হাসপাতালগুলোর ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশিক্ষিত জনবল পদায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে।

বর্তমানে বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে রোগীর উপসর্গ ও বুকের এক্সরের ভিত্তিতে কোভিড রোগী হিসাবে চিকিৎসা শুরু করা হচ্ছে। এ সময়ে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা শুরু করা অতীব জরুরি। কোভিড পরীক্ষা ভর্তির পরও করা যেতে পারে।

যে সমস্ত রোগীর উন্নতি হয়েছে এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার যোগ্য তারা পরপর দুইটি কোভিড টেস্ট নেগেটিভ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়া পান না। সে কারণে হাসপাতালসমূহের একটা বিরাট অংশের বিছানায় এরা অবস্থান করছেন যা এইসব হাসপাতালের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এজন্য যারা ছাড়া পাওয়ার যোগ্য কিন্তু এখনো দুইটি টেস্টে রিপোর্টে পান নাই তাদের জন্য আলাদা আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এটা বাড়িতে বা অন্যত্রও হতে পারে।

(চ) কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহের মধ্যে আন্ত:হাসপাতাল যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। এতে রোগী চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের আদান প্রদান সহজতর হবে।

(ছ) কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহে কোভিড রোগীদের অন্যান্য রোগের কারণে পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখতে হবে। গর্ভবতী মহিলা ও শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকা দরকার।

(জ) অধিক সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মী কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যাতে বিঘ্নিত হয় সেজন্য পূর্বপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি থাকা দরকার।

২। রোগী সেবার মান বৃদ্ধির জন্য কয়েকটি কর্মপদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত মা, শিশু, নবজাতক, হৃদরোগ ও কিডনি ফেইলিওর রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা আলাদা সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।

৩। চিকিৎসাকর্মী, রোগী ও রোগীদের স্বজন বিশেষভাবে মানসিক চাপে থাকেন এবং উদ্বেগ, হতাশা ও ভীতিতে ভোগেন, তাদের মানসিক সহায়তার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞগের সমন্বয়ে একটি সহায়তা প্যানেল গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞগণ টেলিফোনে পরামর্শ দিবেন।

৪। তীব্রভাবে আক্রান্ত বা মুমূর্ষু রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন। এজন্য যথেষ্ট নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র সারা দেশের সব কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালে তৈরি করা দরকার। এখানে যথেষ্ট সংখ্যক প্রশিক্ষিত জনবল ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি থাকা প্রয়োজন। তাদের জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সমূহের সাহায্য নেওয়া দরকার।

৫। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহে তিন-শিফট এর ভাগ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রতি-শিফটে সমন্বয়ের জন্য প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য থাকা প্রয়োজন।

৬। কোভিড শনাক্তের জন্য টেস্ট আরও বেশি সংখ্যায় ও বেশি স্থানে করা দরকার যাতে টেস্টের ফলাফল আরও দ্রুত জানা যায়। কোভিড-১৯ এর জন্য নিয়োজিত ল্যাবরেটরিসমূহ বায়োসেফটি লেভেল-২ অনুযায়ী পরিচালনা করা উচিত। এই ল্যাবরেটরিসমূহে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকা দরকার। বায়োসেফটি ক্যাবিনেট সমূহ নিয়মিতভাবে ক্যালিব্রেশন করা দরকার, এজন্য সার্টিফায়েড ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজন হবে।

স্বল্প মেয়াদে ৫ লাখ টেস্টিং কিট সংগ্রহ করা অতীব জরুরি। প্রয়োজনীয় সংখ্যক নমুনা পাঠিয়ে প্রতিটি ল্যাবরেটরির মান নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। পরীক্ষার রিপোর্ট যথাযথ হওয়ার জন্য জনবলকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ল্যাবরেটরি যাতে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে। টেস্ট এর কেন্দ্র সংখ্যা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনে উন্নয়ন সহযোগীদের সাহায্য নেয়া প্রয়োজন।

৭। (ক) বর্তমানে শুধুমাত্র উপসর্গসহ যেসব রোগী কোভিড নির্ণয় কেন্দ্রসমূহে আসেন, তাদেরই পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে সমস্ত মানুষের উপসর্গ আছে কিন্তু রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে আসছেন না, তাদের খুঁজে বের করে টেস্টের আওতায় আনতে হবে।

(খ) রোগের প্রাদুর্ভাবের ভিত্তিতে (বেশি, মাঝারি ও কমসংখ্যক) এলাকা চিহ্নিত করতে হবে। এই অনুযায়ী কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করে রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

(গ) যে সমস্ত ঘনবসতি এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ (যেমন- শহরের বস্তি, পোশাককর্মীদের বাসস্থান), সেখানে কোন ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হলে এবং তার হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন না হলে, সে যেন আলাদা থাকতে পারে এমন বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

(ঘ) সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে যে সকল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা পর্যায়ক্রমে শিথিল করার জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন।

৮। এ রোগের জন্য ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশসমূহ যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ ও বৈজ্ঞানিকদের সংযুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন।

সফল ভ্যাকসিন তৈরি হওয়ার পর বাংলাদেশের সমগ্র জনগণ যাতে এ ভ্যাকসিন পায় সেজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন থেকেই সচেষ্ট থাকা দরকার।

এমইউ/এমআরএম