তাদের কান্না কি শোনা যায়?

তাদের কান্না কি শোনা যায়?

শহিদুল আজম

‘অ্যাই ছুরি-কাঁচি ধার করাবেন…’। পাশের গলি থেকে ভেসে আসছিল চিৎকার। করোনার এই সময়ে ছুরি-কাঁচি ধার করাতে কেউ কি বাসায় অপরিচিত কাউকে ডাকবে? তাহলে এ লোকটার উপার্জনের কী হবে? সংসারই বা চলবে কী করে? পেছনের বারান্দায় ছুটে গিয়ে তাকে আর পেলাম না। ভবনগুলোর আড়ালে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল তার চিৎকারও। কিন্তু বাড়ির সামনে সিঁড়ি থেকে শোনা গেল কারও কান্নার শব্দ। দরজা খুলতে শুনলাম সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ববিতার মা কাঁদছেন। আগের দিন নাকি খাবার জোগার হয়নি। না খেয়ে থেকেছেন। একটু সহজ-সরল প্রকৃতির বলে বুঝতেও পারেন না, কখন কোথায় গেলে খাবার মেলে।

ববিতার মা, গৃহকর্মী। এই ভবনের তিনটি বাসায় কাজ করেন। এর বাইরেও কাজ আছে। করোনা সতর্কতায় তাকে মার্চের বেতন দিয়েই সবাই ছুটিতে পাঠিয়েছে। কাজের মানুষ, কাজহীন কতক্ষণ ভালো লাগে? মাঝে মাঝে তাই আসেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সুখ-দুঃখের কথা বলেন। কিছু সহায়তা নিয়ে আবার ফিরে যান। বাসায় কাজ করে প্রতিমাসে তার আয় আট থেকে দশ হাজার টাকা। স্বামী রিকশাচালক। বস্তিতে বাসাভাড়া নিয়ে মোটামুটি খেয়ে-পরে ভালোই চলেছে এতদিন। করোনায় স্বামী রিকশা চালাতে পারছেন না। রিকশায় প্যাসেঞ্জার নেই। দিনে জমার টাকাও ওঠে না। তাই বস্তিতেই পড়ে থাকেন। মার্চের আগাম বেতন পেয়ে যতটা খুশি হয়েছিলেন, এখন ববিতার মায়ের চিন্তা বাসাভাড়ার টাকা পাবেন কোথায়? সড়কে গাড়ি চললে গ্রামে ফিরতে পারতেন। এখন সে সুযোগও নেই। স্বপ্নের এই শহরে এসেও খাবার জোগার করতে না পারার অসহায়ত্বে কাঁদছেন তিনি।

মানুষ হিসেবে খুবই অমায়িক ইলেকট্রিশিয়ান ইসরাফিল। দক্ষ। কাজের অভাব নেই। ভীষণ ব্যস্ত। ছোটখাট কাজে সহজে পাওয়া যায় না। দুই মাস আগে কলিং বেলের সুইচ ঠিক করতে ডাক পড়েছিল তার। কোনো একসময় সেটি ঠিক করেই চলে যান। পারিশ্রমিকও নেননি। ফোন করা হয়েছে। ইসরাফিল বলেছেন, পরে একসময় দিয়েন। এখন অনেক কাজ। সেই ইসরাফিলের ফোন হঠাৎ করে। ‘ভীষণ বিপদে আছি। যদি কিছু মনে না করেন, খুচরা বিলটা দিলে উপকার হয়।’ টাকা পাওয়ার দুদিন পর আবারও তার ফোন, ‘কোথায় গেলে খাবার পাব একটু খোঁজ দিতে পারেন?’ করোনায় বন্ধ সব কাজ। বন্ধ বিলও।

কীভাবে চলব, প্রশ্ন ইসরাফিলেরর বাড়ির পাশের মাংসের দোকানদার মোহাম্মদ আলীর। গরুর সামনের রানের মাংস কিংবা কলিজা নিতে হলে আগের দিন জানিয়ে রাখতে হয়। অথবা সকাল সকাল লাইনে দাঁড়াতে হবে। বেলা বাড়তে শুরু করার আগেই তার দোকানের মাংস বিক্রি শেষ। সেই মাংস বিক্রেতার ফোন সকাল ১১টায়। ‘ভালো মাংস ছিল। দিয়ে দেব নাকি ৫/৬ কেজি।’ বারান্দা থেকেই দেখা যায় তার দোকান। অলস বসে থাকেন প্রতিদিন। করোনাকালে মাংসের ব্যবসাও নেই। ডানে বাঁয়ে এ রকম কত মানুষই আছেন কত পেশার। কদিন আগেও তারা ভালো ছিলেন। আজ অসহায়। দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। শেয়ারবাজারে যেমন রাজা থেকে ফকির এক নিমিষে। করোনাকালেও তাই। অন্ধকার বর্তমানই। ভবিষ্যৎ ভাবনারও সযোগ নেই আপাতত। তাই, ঘর থেকে বেরুবেন না, শত আকুতিতেও কোনো লাভ নেই। ঘর থেকে কারও কারও বের হতেই হবে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজতে।

করোনার সংকট বিশ্বজুড়েই। ভালো নেই কেউ। যে যার মতো লড়ছেন। উন্নতবিশ্বে নাগরিকদের প্রণোদনার শেষ নেই। বাড়ির দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে খাবার। ব্যাংক হিসাবে অর্থ। তাদের চিকিৎসাব্যবস্থাও আধুনিক। তারপরও মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। লকডাউনে সমাধান খুঁজছে ওইসব দেশের সরকার। অর্থ-খাবার পেয়েও সেসব দেশের মানুষ হতাশাচ্ছন্ন ঘরবন্দি থাকার যন্ত্রণায়। সেখানেও রাষ্ট্র এগিয়ে এসেছে পরামর্শদাতা হয়ে। আমরা তাদের মতো উন্নত নই। আমাদের সীমাবদ্ধতারও শেষ নেই। এ রকম পরিস্থিতিতে কতটা আর ভালো থাকা যায়। মেনেই নিয়েছি কমবেশি সবাই। তবুও ক্ষুধার যন্ত্রণা, অর্থশূন্যতার কষ্ট নিয়ে মরতে চায় কে?

আমরা তো আর সত্তর, আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকে নেই। এখন নিজের টাকায় পদ্মাসেতু বানাতে পারি। প্রায় লাখ কোটি টাকার প্রণোদনাও দিতে পারে সরকার। চোখের সামনে দেখা ফ্লাইওভার আর প্রশস্ত সড়কগুলো শুধু নয়, মানুষও শিখেছে নিজের পায়ে দাঁড়াতে, উন্নতজীবনের স্বপ্ন দেখতে। যা কিছু ত্রুটি আর প্রশ্ন সরকারের ব্যবস্থাপনা আর রাজনীতির চরিত্র নিয়ে। মানবিক এ বিপর্যয়ে দুই-একটা চালচোরই বিরাট আস্থাহীনতা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। উন্নতবিশ্বেও হাত পেতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ আছে। আমাদের এখানেও আছে। তবে, সংখ্যাটা কমছে। টুকটাক ব্যবসা স্বপ্ন দেখাচ্ছে স্বাবলম্বী হওয়ার।

স্বামী-স্ত্রী মিলে ভ্যানের ওপর তরকারির দোকান সাজিয়ে দিব্যি চালিয়ে নেয়া যাচ্ছে সংসার। ভালোই তো আয় রাজমিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রি ইলেকট্রিশিয়ানদের। একের পর এক উঁচু দালান উঠছে চারদিকে। এসব কাজের কদর বেড়েছে। শেষ সম্বল বিক্রি করে কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেউ নাম লিখিয়েছেন উবার-পাঠাওয়ে। একদিন ভাগ্য ফিরবে স্বপ্ন তাদের। তারাওতো হাতপাতা মানুষ নয়। রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামতে পারলেই তাদের আয়। ঘরবন্দি হয়ে এখন তারাই খাবার সংকটে। ঋণের দায় কীভাবে মেটাবেন, হিসাব মিলছে না।

স্বল্প আয়ের আরও অনেক পেশাই আছে। এর কোনো কোনোটিতে অর্থের চেয়ে মর্যাদাকে খুঁজে ফিরেন মানুষ। আত্মসম্মান নিয়ে কষ্টে বেঁচে থাকা এই শ্রেণির মানুষই সবচেয়ে বিপদে এখন। তারা না পারেন অভাবগ্রস্ততা নিয়ে রাস্তায় নামতে। না পারছেন সহ্য করতে। তাই, তাদের সব চাওয়া-পাওয়া রাষ্ট্র আর সরকারের কাছেই। পোশাক শ্রমিকদের মালিকরা প্রভাবশালী। সরকারি কর্মকর্তারা নীতিনির্ধারণের অংশ। নিজেদের দাবিগুলো আদায় করে নেয়ার ফর্মুলা তাদের জানা। কিন্তু আলাদাভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই করা এইসব মানুষের দাঁড়ানোর প্লাটফর্ম কোনটি? কে তাদের দুর্দশার কথাটি সরকারের শীর্ষমহল পর্যন্ত পৌঁছে দেবে? সরকারের যেকোনো ঘোষণায় তাই কৌতুহল- কে আছেন কোন তালিকায়?

প্রণোদনা ঘোষণা হয়েছে। বলা হচ্ছে, একজন মানুষও না খেয়ে মরবে না। কিন্তু এখনই তো কান্না শুনতে পাচ্ছি চারদিকে। যে পোশাকশিল্প নিয়ে সরকারের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব, করোনাভীতিতেও হতাশা, বিক্ষোভ দেখছি। সরকার কি জানে, কতগুলো প্রতিষ্ঠান তার কর্মীদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে রাজি? কে কোন মাসের বেতনই বা পেয়েছেন?

আপনি যখন ছুটি ঘোষণা করবেন, মানুষকে বাড়িতে থাকার কথা বলবেন, তখন তার ঘরের খোঁজ নেয়াও আপনার দায়িত্ব। ছুটিতে বন্ধ সব প্রতিষ্ঠান। অর্থ সঞ্চালন নেই। দায়-দেনা বেড়েই যাচ্ছে। সে দায়ে কারও কারও করোনাভীতিও হারিয়ে যাচ্ছে। তাই হয়তো করোনার বিস্তার ঠেকাতে ঘরে থাকার আহ্বান নিস্ফল।

করোনার সংকট বিশাল। বড় যুদ্ধ। অর্থনীতির কঠিন মারপ্যাঁচ সাধারণ মানুষ বোঝে না। দুমুঠো ভাত আর একটু সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার মধ্যবিত্তের একমাত্র চাওয়া। তাই মানুষকে ঘরে ঢোকানোর কথা বলার সময় তার অবস্থাও জানতে হবে। যারা সময়ে, ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে নিজের ভাগ্য বদলে ফেলতে পারে, তারা সুবিধাবাদী। নীতিনির্ধারণীতে এইসব মানুষের আধিক্যে ভুল পরিকল্পনা, মিথ্যাচারেরর বিস্তৃতি ঘটে। চিকিৎসকরা সুরক্ষা পান না। চিকিৎসাব্যবস্থায় ঘাটতি থাকে। অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কারও কোনো কিছুই গোপন নয়। কোন দেশ কীভাবে লড়ছে তা যেমন জানা সম্ভব, এদেশেও কী হচ্ছে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সে চেষ্টা বৃথা।

জীবনের মায়া সবারই আছে। নিজের জীবন বাঁচাতে সরকারের প্রতি মুহূর্তের কর্মকাণ্ডের দিকেই সবার নজর। আমরা ব্যাপক প্রস্তুতির কথা শুনছি। আবার চোখের জলও দেখছি মানুষের। কাপড়ে মুখ লুকিয়ে সাহায্য চাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। টিসিবির ট্রাকের জন্যে অপেক্ষা আর লম্বালাইনও দেখছি প্রতিদিন। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখা মানুষগুলো হতাশায় ডুবে গেলে প্রস্তুতি প্রমাণ করা যাবে না। চূড়ান্ত নিঃস্ব হওয়ার আগেই তাই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। দুঃসময়ে মানুষকে আশাবাদী করার দায়িত্বটা সরকারেরই।

লেখক : হেড অব ইনপুট, এটিএন নিউজ।

এইচআর/বিএ/পিআর