ত্রাণ, সম্মান ও মূল্যবোধ

ত্রাণ, সম্মান ও মূল্যবোধ
  • 1
    Share

এম মাহফুজুর রহমান

দেশের ত্রাণচোরদের নিয়ে কথা বলতে মন এগোয়। কিন্তু কি-বোর্ডটা বলে- থাক। রুচিহীন বিষয় নিয়ে লেখার দরকার কী? ওসব প্রশাসনের বিষয়। তারাই দেখুক। তথাস্তু। তার চেয়ে বরং অন্য কথায় যাওয়া যাক।

‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর একটি প্রতিবেদন পড়তে গিয়ে চোখ আটকে গেল এক জায়গায়। একটি ছবিতে। তার ক্যাপশনে। তার অবয়বে। ইতালির একটি শহরের কোনো গলিতে তোলা ওই ছবি। দেখা যাচ্ছে, কয়েকটি ‘ফুড বাস্কেট’-এ বোঝাই করা ফলমূল-খাদ্যদ্রব্য রয়েছে। কোনোটা শূন্য। কাগজে লেখা ঝুলছে- ‘আপনি এখান থেকে খেতে পারেন। এখানে খাবার রেখে যেতে পারেন।’ অর্থাৎ যার ক্ষুধা লাগবে সেখান থেকে নিয়ে খেতে পারবেন। আবার যার মনে হবে কাউকে সাহায্য করবেন, তাও রাখতে পারেন।

কোনো ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাস্তার নির্দিষ্ট স্থানে ত্রাণসামগ্রী রাখা আছে। কোথাও বা দেখা যাচ্ছে, বাসার ব্যালকনি থেকে খাবার-পানীয়ভর্তি ঝুড়ি নিচে নেমে গেছে। এসবই তাদের খাদ্যসহায়তার অংশ। পথিকের জন্য। তাদের জন্য যারা এই করোনাদুর্যোগে কর্মহীন বা অন্য কোনোভাবে অসহায় হয়ে পড়েছেন। কিংবা তৃষ্ণার্ত-ক্ষুধার্ত কোনো পথিকের জন্য। এসবই জনগণের পক্ষ থেকে জনগণের জন্য। ঝুড়ি থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণই তুলে নিচ্ছেন অসহায় মানুষ। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নয়। সাধারণ জনগণ এটি সেখানকার সরকার থেকে আদিষ্ট হয়ে করছেন এমন নয়। এটি স্বপ্রণোদিত। সরকারি সহায়তা সরকার দিয়ে যাচ্ছে।

ফেসবুক, টুইটার, মাইস্পেস ও ইনস্টাগ্রামসহ সোশ্যাল মিডিয়ায়ও এ রকম অনেক ছবি ভাসছে। এসব ছবির প্রায় সবগুলোই ইউরোপসহ পাশ্চাত্য দেশের। কখনো কখনো উন্নত অন্যান্য দেশের। এসব তাদের সভ্যতা আর মানবতার অংশবিশেষ। শুধু করোনাকালে নয়, যেকোনো জাতীয় বা আঞ্চলিক দুর্যোগে এভাবে তারা মানুষকে সম্মানের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। এভাবে তারা সভ্য হয়ে উঠেছেন হাজার বছর ধরে। তারা মানুষকে সাহায্য করছেন কিন্তু কোনো ছবি তুলে রাখছেন না সাহায্যপ্রাপ্তদের। কিংবা তাদের সঙ্গে কোনো সেলফি তুলে রাখার বাসনাও লক্ষ্য করা যায় না। লোক দেখানো সাহায্য করার ঘটনা তাদের জন্য বিরল। সাহায্য করার অর্থেই করছেন এবং সাহায্যপ্রাপ্তদের সম্মান রক্ষা করেই তা করা হচ্ছে।

একজন ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীর একটি কথা আমাকে বেশ স্পর্শ করেছে। তিনি জানালেন, ‘দেখেন ভাই, আমার শোরুমের স্টাফসহ এখানকার অনেক মানুষকে ত্রাণসামগ্রী দিয়েছি। এমনকি অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির স্থানীয় সাব-ডিলারকেও সহায়তা করেছি। বাসায় বাসায় এসব খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছি। কিন্তু আমি সাহায্যপ্রাপ্তদের কারও ছবি তুলিনি। কারণ তাদের লজ্জায় ফেলার মতো অধিকার নেই আমার। তারা আজ অসহায়। দুর্যোগ শেষ হলে কাজকর্ম করে তারা জীবন স্বাভাবিক করে নেবেন আবার। ছবি তোলার মতো হালকা কাজটা করে তাদের আমি ছোট করতে চাই না। এটা আমার রুচির বাইরে।’

সমাজে এমনতর অনেক পরিশীলিত-রুচিশীল মানুষ আছেন। তাদের জন্যই হয়তো সমাজে কিছুটা হলেও ভারসাম্য বিরাজমান। কিন্তু এমনতো অনেকে আছেন যারা ১০-১২ জন মিলে একটি ‘সাবান’ কিংবা ৫-৭ জন মিলে এক কেজির ‘একটি আটার প্যাকেট’ (রূপকার্থে) কোনো অসহায়ের হাতে তুলে দিচ্ছেন! সেই ছবির ফ্রেমে থাকার জন্য আবার দাঁড়িয়ে আছেন ২০-২৫ জন! কিংবা ত্রাণের প্যাকেট ট্রাক থেকে কিংবা ভ্যান থেকেই সাহায্যপ্রাপ্তদের ওপর ছুড়ে দিচ্ছেন। কেউবা ‘লাইন ধরুন, ত্রাণ নিন’ টাইপের ত্রাণ দিচ্ছেন।

এসব সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থার প্রায় সবার ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এই প্রবণতা রাজনৈতিক-সরকারি-বেসরকারি ত্রাণকর্মী প্রায় সবার মধ্যেই রয়েছে। কোনোভাবেই ছবি তোলার বিরুদ্ধে নই। জাতীয় এ দুর্যোগের সময় ছবি তোলা যেতেই পারে। কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন আছে বইকি। কিন্তু ওই যে ১০-১২ কিংবা ৫-৭ জনের কথা উল্লেখ করেছি তাদের মতো ছবি তোলার কি কোনো অর্থ আছে? অথচ হরদম এটা লক্ষ্য করা যায়।

আমরা (ব্যক্তি পর্যায় থেকে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা পর্যন্ত যারা ত্রাণ বা সাহায্য বিতরণ করছি) কি একবারও সাহায্যপ্রাপ্তদের জিজ্ঞেস করেছি- আপনারা কি নিজের ইচ্ছায় ছবি তুলতে চান? আপনি কি ছবি তুলতে আগ্রহী? আপনার-আপনাদের সঙ্গে কি আমরা ছবি তুলতে পারি? বা ছবি যদি সোশ্যাল মিডিয়াসহ সব জায়গায় ছড়িয়ে যায় তাতে কি আপনার সম্মানহানি হবে?

যারা অসহায় মানুষের ছবি তুলছেন বা ছবি তোলা নিয়ে বা লোক দেখানো সাহায্য দেয়া নিয়ে ‘ক্রেজি’। তাদের জন্য অনুরোধ- সাহায্যপ্রাপ্ত মানুষদের ছবি তোলার সময় অবশ্যই তাদের এসব প্রশ্ন করতে পারেন। তাহলে বুঝবেন কী প্রতিক্রিয়া হয়। নিজে রিফিউজি বা দুর্যোগ আক্রান্ত ভেবে নিজেকেই এসব প্রশ্ন করুন না। দেখবেন কী উত্তর আসে! ত্রাণ দিয়েছি। ছবি তুলেছি। ছবি তোলায় কিসের সম্মান হানি! এ রকম ভাবনা অলিতে গলিতে আছে। তাই ছবি-সেলফির মতো এসব ছোটখাটো-সামান্য ‘মূল্যবোধ’ কথন না হয় বাদই দিলাম।

ত্রাণের জন্য মারামারি করে অসহায় মানুষ। ত্রাণ চাইতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন। ত্রাণ চুরি করেন রক্ষকরা। ত্রাণের চাল পুকুরে ডোবে। তেল বা তেলের ‘খালি বোতল ভাসে নদীতে’। ত্রাণের তেলে খাটের তলা হয় ‘তেলের খনি’। ত্রাণ সঠিকভাবে না পেয়ে ‘ত্রাণের ট্র্যাক লুট’ করেন সাধারণ মানুষ। এসবই সমাজের চিত্র। আমাদের মূল্যবোধের চিত্র। এসবই আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-পারিপার্শ্বিক মূল্যবোধ। এসব মূল্যবোধের ইতিবাচক পরিবর্তনে নিদেনপক্ষে আরও একশ বছর সময় খোয়াতে হবে প্রিয় এ ভূমির।

উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। আর তাই দুর্যোগকালে ত্রাণচোরদের এত ছড়াছড়ি। এসব কারণেই একটার পর একটা ত্রাণ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। সভয়ে-নির্ভয়ে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার লিস্ট পৌঁছে দেয়া যায়। ভোটের সময় দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাওয়া যায়। প্রশ্ন করা যায়, তাহলে মানুষের দ্বারে কেন ত্রাণ পৌঁছানো যায় না? কেন রাস্তায় নামতে হবে ত্রাণের জন্য। কেনই বা ত্রাণ নিয়ে এত বিশৃঙ্খলা হবে? বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য দরকার সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা।

রাস্তাঘাটে যেভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে তাতে করোনাঝুঁকি আরও বাড়ছে বৈ কমছে না। একই পরিবার বারবার পাবে আর কেউ একবারও পাচ্ছে না- এমনটি না হওয়া নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ত্রাণ গ্রহণ করাও একটি সামাজিক অপরাধ। যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ ও গ্রহণের নিয়মাবলি লিখিতভাবে প্রকাশ করে তা গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

‘পরিচয় গোপন রেখে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা আপনার বাসায় পৌঁছে দেব’- প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণ মুগ্ধ ও আশান্বিত করবে। তেমনি করোনাকালে বকেয়া বেতনের দাবিতে কোনো বিত্তশালীর ‘হ্যাচারি শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছেন’ শুনেও দুঃখিত হই।

আমি যদি আমার পরিচিতজনদের আগে সহায়তা দিই। আপনি যদি আপনার পরিচিতজনকে আগে সাহায্য দেন। তারপর অন্যদের। আর সরকারি সহায়তাতো সর্বত্র আছেই। তাহলে কি সাহায্য পাওয়া থেকে কেউ বাদ যেতে পারেন? তাতে কি কোনো ছবি তোলার দরকার আছে? আমি আমার পাশের পরিচিত অসহায়কে খেয়াল করছি না। আমি আমার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কে অসহায় হয়ে পড়েছে তার খেয়াল করছি না। অথচ আমি ঢাক পিটিয়ে সহায়তা দিচ্ছি! পাশ্চাত্য থেকে আমরা ‘ছেড়া প্যান্ট’ সংস্কৃতিটা নিয়েছি কিন্তু তাদের অলি-গলিতে যে ‘মানবতার সংস্কৃতি’ রয়েছে সেটি নিইনি।

লেখক: সাংবাদিক

এইচআর/বিএ/পিআর