দোয়া ভয় বিধান ও নেয়ামতের কথা পড়া হবে আজ

যে কারণে রমজান বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ
  • 1
    Share

রমজানের রোজা মুমিন মুসলমানের ফরজ ইবাদত। যুগে যুগে সব নবি-রাসুলের প্রতি এ রোজা ফরজ ছিল। রোজার মূল বিষয় হলো আল্লাহকে ভয় করা। আজকের তারাবিহতে আল্লাহকে কিভাবে ভয় করতে হবে সে বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া আল্লাহর যে ভয়ের সঙ্গে গোনাহ থেকে মুক্তি লাভ করবে মুমিন, তাও পড়া হবে আজ।

আল্লাহর কাছে তাওবা-ইসতেগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা করা মুমিন মুসলমানের বৈশিষ্ট্য ও অন্যতম কাজ। আল্লাহ তাআলাও বান্দার জন্য কুরআনে ক্ষমা প্রার্থনার ভাষা শিখিয়ে দিয়েছেন। মানুষ তার কর্মের কারণে যেসব গোনাহে জড়িত হয়, তা থেকে মুক্তি পেতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দোয়াও পঠিত হবে আজ।

আল্লাহ তাআলা কুরাআনুল কারিমে মানুষ উদ্দেশ্য করে ঘোষণা করেন, হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।‘ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১০২)

মানুষকে রমজান দান করা হয়েছে এ ভয় অর্জন করার জন্য। আবার যে মহামানবের উপর কুরআন নাজিল হয়েছে,  তাঁকেও মুমিন মুসলমানের জন্য নেয়ামত হিসেবে পাঠিয়েছেন। যিনি মুসলিম জাতিকে দেখিয়েছেন সঠিক পথ। আবার এ পথের বাঁকে বাঁকে কিভাবে চলতে হবে দেখিয়েছেন সে পথও। আল্লাহ বলেন-

আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবি পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তুতঃ তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট।‘ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৬৪)

এ রকম অসংখ্য নেয়ামতের কথায় ভরপুর আজকের তারাবিহ। যা মুমিন মুসলমানের হৃদয়ে যেমন দ্বীন ও ইসলামি জীবন-যাপনে উৎসাহের ঝড় তুলবে তেমনি নিজেদের গোনাহ থেকে মুক্তি লাভে ক্ষমা-প্রার্থনায় রোনাজারিতে অস্রু বিসর্জন দেবে। হাফেজে কুরআনরা আজ দেড় পারা তেলাওয়াত করবেন। সুরা আল-ইমরানের ৯২নং আয়াত থেকে সুরাটির শেষ পর্যন্ত এবং সুরা নিসার ১-৮৭ নং আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে।

সুরা আল-ইমরান

মদিনায় অবতীর্ণ ২০ রুকু ও ২০০ আয়াত বিশিষ্ট সুরা এটি। এ সুরার আয়াতগুরো প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পর বিভিন্ন সময়ে নাজিল হয়। আজ ৯২ থেকে ২০০নং আয়াত তেলাওয়াত করা হবে। এ অংশে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া-

– গোনাহ মুক্তির দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِىٓ أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكٰفِرِينَ

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আমাদের অপরাধগুলো এবং আমাদের কাজ-কর্মে বাড়াবাড়িগুলোকে তুমি ক্ষমা করে দাও, আমাদেরকে দৃঢ়পদ রেখ এবং কাফিরদলের উপর আমাদেরকে সাহায্য কর।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৪৭)

– সুখ ও দুঃখে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলা-

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ

অর্থ :  ‘আমাদের জন্যে আল্লাহ্ই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৭৩)

– আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া-

الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيٰمًا وَقُعُودًا وَعَلٰى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِى خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بٰطِلًا سُبْحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ – رَبَّنَآ إِنَّكَ مَن تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُۥ ۖ وَمَا لِلظّٰلِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ

অর্থ : যাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে, ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষযে, (তারা বলে) ‌হে পরওয়ারদেগার! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদিগকে তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও। হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয় তুমি যাকে দোযখে নিক্ষেপ করলে তাকে সবসময়ে অপমানিত করলে; আর জালেমদের জন্যে তো সাহায্যকারী নেই।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৯১-১৯২)

– ঈমানদার যেভাবে গোনাহ থেকে মুক্তি চাইবে-

رَّبَّنَآ إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِى لِلْإِيمٰنِ أَنْ ءَامِنُوا بِرَبِّكُمْ فَـَٔامَنَّا ۚ رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّـَٔاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ

অর্থ : হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহবানকারীকে ঈমানের প্রতি আহবান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আন; তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতপর আমাদের সব গোনাহ মাফ কর এবং আমাদের সব দোষত্রুটি দুর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৯৩)

– পরকালের অপমান থেকে বাঁচার দোয়া-

رَبَّنَا وَءَاتِنَا مَا وَعَدتَّنَا عَلٰى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيٰمَةِ ۗ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ

অর্থ : হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দাও, যা তুমি ওয়াদা করেছ তোমার রসূলগণের মাধ্যমে এবং কিয়ামতের দিন আমাদিগকে তুমি অপমানিত করো না। নিশ্চয় তুমি ওয়াদা খেলাফ করো না। (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৯৪)

সুরাটির বাকি অংশে মানুষের হেদায়েতের জন্য যেসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত সূচি হলো-

– আয়াত ৯২-২০০

>> দান-সাদকার ছাওয়াব প্রাপ্তি;

>> হালাল ও হারামের ব্যাপারে তাওরাতের নীতির পাশাপাশি কুরআনের নীতির উল্লেখ;

>> মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা এবং পবিত্র কাবা শরীফের ইতিহাস ও মর্যাদা সম্পর্কিত বিষয়।

>> মুসলমানের শরীরিক ও আর্থিক ইবাদত হজ ফরজ হওয়ার প্রসঙ্গ;

>> নেতা নির্বাচন ও নেতৃত্বের গুণাবলীর আলোচনা;

>> তাকওয়ার হক সম্পর্কিত বিষয় ও ইসলামের ঐক্যের গুরুত্ব;

>> ইসলামের প্রথম সামরিক বিজয় বদর যুদ্ধের পটভূমি;

>> ওহুদ যুদ্ধ ও ওহুদ যুদ্ধের পটভূমি এবং মুনাফিকদের বিশ্বাসঘাতকতা বিষয়টিও ওঠে এসেছে সুরার এ অংশে।

>> অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সুদের চারিত্রিক ও অর্থনৈতিক ভয়াবহ অনিষ্টতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও ওঠে আসবে আজকের তারাবিতে।

>> গাযওয়ায়ে হামরাউল আসাদের ঘটনা, ওহুদ যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে গাযওয়ায়ে বদরে সোগরা এবং ইসলামের জন্য যুদ্ধে নিহতদের শহীদ এবং জীবিত হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। সর্বোপরি আসমান ও জমিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং ধৈর্য অবলম্বনের বিষয়টিও ওঠে এসেছে এ সুরায়।

সুরা নিসা

কুরআনুল কারিমের ৪র্থ সুরা এটি। তৃতীয় হিজরির শেষ দিকে শুরু হয়ে পঞ্চম হিজরির প্রথম সময় পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে মদিনায় নাজিল হয়েছে সুটি। ২৪ রুকুর এ সুরাটিতে রয়েছে ১৭৬ আয়াত। আজ সুরাটির ৮৭ আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত হবে। এ অংশে রয়েছে রাষ্ট্রীয় জুলুম অত্যাচার থেকে হেফাজত থাকার গুরুত্বপূর্ণ একটি আবেদন। আর তাহলো-

رَبَّنَآ أَخْرِجْنَا مِنْ هٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا

‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এ যালিম অধ্যূষিত জনপথ হতে মুক্তি দাও, তোমার পক্ষ হতে কাউকেও আমাদের বন্ধু বানিয়ে দাও এবং তোমার পক্ষ হতে কাউকেও আমাদের সাহায্যকারী করে দাও।’

পারিবারিক জীবনের শক্তবন্ধন দাম্পত্য জীবন এবং বিবাহ সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়গুলো ওঠে এসেছে এ সুরায়। বিয়ে-শাদী সংক্রান্ত বিধানগুলো পড়া হবে আজ। সুরাটির ৮৭ আয়াত পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত সূচি তুলে ধরা হলো

– আয়াত ০১-১৪

>>ইয়াতিমদের বিবাহ করার হুকুম;

>> পুরুষের একাধিক বিবাহ প্রসঙ্গ এবং

>> এক মহিলার একাধিক স্বামী গ্রহণ করার বিধান।

>> দাসিদের বিয়ে;

>> ইয়াতিম মেয়েদের অধিকার সংরক্ষণ;

>> নারীর অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও বিধান;

>> ইসলামের উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান ও মূলনীতি।

– আয়াত ১৫-২৩

>> সুখী দাম্পত্য জীবন গটনে ব্যভিচার দমনের বিধান;

>> সমকামিতার শাস্তির সুস্পষ্ট বর্ণনা;

>> নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা;

>> স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূলভিত্তি;

>> ইসলামে যাদেরকে বিয়ে করা হারাম এবং

>> আইন প্রণয়নের অধিকার।

– আয়াত ২৪-৩৫

>> যুদ্ধবন্দি নারীদের প্রসঙ্গ;

>> পরিবারিক সমাজ ব্যবস্থার প্রথম বুনিয়াদ বিয়ের কিছু মূলনীতির পাশাপাশি জাহেলি সমাজের বিয়ে প্রসঙ্গ;

>> ক্রীতদাসিদের বিয়ে;

>> ইসলামে নারী-পুরুষের অবস্থান;

>> ইসলামে নেককার স্ত্রীর গুণাবলী;

>> ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় বিধান;

>> মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক লেনদেন, বড় গোনাহ পরিহারে ছোট গোনাহ মাফের আশ্বাসও রয়েছে আজকের তারবিহতে পঠিত কুরআনের এ অংশে।

আয়াত ৩৬-৪৩

>> মাদক গ্রহণের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রথমিক ও মাদক দ্রব্য হারাম হওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণার পাশাপাশি সমাজে অনাচার ও অনিয়ম নির্মূলে কুরআনের নীতির বিষয়টি ওঠে এসেছে।

– আয়াত ৪৪-৫৭

>> আহলে কিতাবের অনুসারীদের অজ্ঞতা ও জঘন্য চরিত্রের আলোচনার পাশাপাশি জিবত ও তাগুত প্রসঙ্গ এবং সত্য মিথ্যার সংঘাতের সুস্পষ্ট বিষয়াবলী পঠিত হবে আজ।

– আয়াত ৫৮-৭০

>> ইসলামে ইজতিহাদ ও কিয়াসের প্রমাণ; ন্যায় বিচারের মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি বিধান বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ক্ষমতার আবশ্যকতার গুরুত্বও ওঠে এসেছে আজকের তারাবিহতে।

– আয়াত ৭১-৮৭

>> সর্বোপরি মানুষের শ্রেণি বিন্যাস, সমরবিদ্যা, ইসলামে জিহাদের গুরুত্ব, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, মানবীয় বোধ শক্তির সীমাবদ্ধতাসহ পারস্পরিক সালাম বিনিময়ের গুরুত্ব এবং আল্লাহ-রাসুলের আনুগত্যশীলরা নবি-সিদ্দিকের সঙ্গী হওয়ার সুস্পষ্ট ঘোষণাও পড়া হবে আজ।

আল্লাহর প্রেমে আত্মহারা মুমিন মুসলমান ঘরে ঘরে তারাবিহ আদায় করবে। তারাবিহ নামাজের আগে এ অংশের তাফসির, অধ্যয়ন কিংবা তেলাওয়াত করায় থাকবে অনেক বেশি ফজিলত। আর গুরুত্বপূর্ণ এ দোয়াগুলো তাতে শেখা হয়ে যাবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে রমজানের যাবতীয় নেয়ামত লাভে তারাবিহ আদায় করার তাওফিক দান করুন। কুরআনের নূরে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/জেআইএম