লকডাউন : অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও বাঁচিয়েছে অমূল্য প্রাণ

লকডাউন : অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও বাঁচিয়েছে অমূল্য প্রাণ
  • 2
    Shares

করোনা মোকাবিলায় লকডাউনের কারণে অনেকে হাঁপিয়ে উঠেছেন। অনেকে অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কিন্তু এ লকডাউনই বাঁচিয়েছে বহু মানুষের অমূল্য প্রাণ। দক্ষিণ এশিয়ার লকডাউন না করা একমাত্র দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনায় এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে এখনও পর্যন্ত করোনাভাইরাস আক্রান্ত ও মৃতের হার অনেক বেশি। এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলো করোনা মোকাবিলায় লকডাউনের নীতি নিলেও পাকিস্তান সে পথে যায়নি। ফলে লকডাউন করা বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো প্রাণহানি এড়াতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড-১৯ ডেটা বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

গত ৩০ মার্চের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভূটান, মালদ্বীপ লকডাউন করা হয়। কিন্তু পাকিস্তান লকডাউন করেনি। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৩০ মার্চের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশেই প্রতি লাখ জনসংখ্যার মধ্যে করোনা আক্রান্তের হার একের কম ছিল। কিন্তু এ সময়ের পর লকডাউন না করা পাকিস্তানে এ হার বাড়তে থাকে। ২৫ এপ্রিলের মধ্যে এ হার প্রতি লাখে ৫.৭৮ এ গিয়ে দাঁড়ায়। দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ হাজার ৭২৩। পাকিস্তানে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত মারা যায় ২৬৯ জন। অর্থাৎ প্রতি লাখে মৃত্যুর হার ০.১২। সে তুলনায় বাংলাদেশে আক্রান্ত ও মৃতের হার প্রায় অর্ধেক। গত ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে মারা গেছেন ১৪০ জন। আর মোট আক্রান্ত ৪৯৯৮ জন।

লকডাউন না করা পাকিস্তানের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তথ্য তুলনা করে সম্প্রতি চেন্নাই ম্যাথমেটিক্যাল ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সৌরিস দাশ তার এক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, পাকিস্তানের তুলনায় ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন করা বাংলাদেশে ৫৪, ভারতে ৮০৭, শ্রীলঙ্কায় ১৯, নেপালে ১৫ জনের প্রাণহানি কম হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লকডাউন চালু থাকলেও ১ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার বেড়েছে। যদিও এ সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে মৃত্যুর অনুপাত ক্রমশ কমেছে। এ দেশগুলোতে সংক্রমিত হওয়া রোগীরা ক্রমশ বেশি হারে সুস্থ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশে একদিকে আক্রান্ত, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে সুস্থ হয়ে ওঠার হারও অনেক কম।

দুই কারণে মূলত দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর (পাকিস্তান ছাড়া) তুলনায় বাংলাদেশ বাজে অবস্থায় পড়েছে বলে মনে করি। প্রথমত, এখানে লকডাউন ঠিকমতো মানা হচ্ছে না। লকডাউন ঘোষণার পরও তৈরি পোশাক শ্রমিকদের ঢাকামুখী বিপুল স্রোত তৈরি হয়েছিল। তৈরি পোশাক কারখানার মালিকরা এক্ষেত্রে চরম খামখেয়ালিপনার পরিচয় দিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জে কর্মরত বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর লকডাউনের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে করোনা সারাদেশে ছড়িয়েছে বেশি। আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের একাধিক স্থানে জানাজার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ জমায়েত হয়। যা ছিল করোনা মহামারি মোকাবিলায় বড় হুমকি। এছাড়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ইসকনে জমায়েতের ফলেও করোনা ছড়িয়েছে। তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মসজিদ বা অন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে জনসমাগম নিয়ে যে আশঙ্কা ছিল তা সরকার বেশ ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। না হলে করোনা আরও ছড়িয়ে পড়ত।

দ্বিতীয়ত, করোনা চিকিৎসায় এখনও ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। করোনা চিকিৎসার হাসপাতালগুলোতে নানা অব্যস্থাপনা রয়েছে। চিকিৎসক, সেবিকাসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বেশির ভাগই ভয়, আতঙ্কে এখনও করোনা রোগীদের যথাযথ সেবা দিচ্ছেন না। ফলে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম।

বাংলাদেশে লকডাউন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে করোনা মোকাবিলায় আরও সাফল্য আসত। আর লকডাউন না করলে হয়তো পাকিস্তানের মতো বা তার চেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতো। করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নীতি ও ফলাফল দেখে এটা সহজেই বোঝা যায়, করোনা মোকাবিলায় এখনও পর্যন্ত লকডাউনের চেয়ে ভালো বিকল্প পাওয়া যায়নি।

লেখক : সাংবাদিক

এইচআর/বিএ/এমএস