'স্যার ছিলেন বলেই করোনাকে হারাতে পেরেছি'

স্যার ছিলেন বলেই করোনাকে হারাতে পেরেছি
  • 3
    Shares

‘স্যার আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হয় আমি মারা যাচ্ছি’ – রাত আড়াইটায় ফোন করে জেলার পুলিশ সুপারকে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে এমনটিই বলছিলেন, আইসোলেশন ওয়ার্ডে মৃত্যু ভয়ে শঙ্কিত শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তোফায়েল হোসেন।

সেই রাতে আর ঘুমোতে পারেননি পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম। দীর্ঘ সময় টেলিফোনে তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। মানসিকভাবে সাহস দিয়েছেন।

শুনিয়েছেন, করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন ফিরে পাওয়া অনেকের সাফল্যের গল্প।

ভোর না হতেই এসপি খবর নিয়েছেন আক্রান্ত পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের। ফুল, ফল আর খাবার নিয়ে নিজেই ছুটে গেছেন হাসপাতালে। সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই আক্রান্ত পুলিশ কর্মকর্তার সামনে দাঁড়িয়েছেন। নিয়েছেন চিকিৎসার খোঁজখবর।

কেবল তোফায়েল আহমেদ একা নয়। তার মতো ঝিনাইগাতী থানার আরেক এস আই সাইদুর রহমান খানকেও সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন তিনি।

নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে কথা বলেছেন। যোগাযোগ রেখেছেন, করোনা ভাইরাস আক্রান্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের স্বজনদের সঙ্গেও। ময়মনসিংহ থাকা পরিবারের সদস্যদের কার কি প্রয়োজন সেটা মিটিয়েছেন। পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে বাচ্চাদের জামা কাপড় থেকে শুরু করে বাসার কাঁচাবাজার – সেটাও নিয়মিত পৌঁছে গেছে করোনা আক্রান্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে।

আক্রান্ত হওয়া দুই পুলিশ সদস্য
আক্রান্ত হওয়া দুই পুলিশ সদস্য


এভাবেই আক্রান্ত দুই সহকর্মীর পাশে থেকে তাদের নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে অদম্য প্রত্যয়, সাহস আর অনুপ্রেরণা জুগিয়ে পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম নিজেও শামিল হয়েছেন করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজ বাহিনীর সদস্যদের সুস্থ করার যুদ্ধে।

পুলিশের ২৪ ব্যাচের মেধাবী কর্মকর্তা কাজী আশরাফুল আজীম। শেরপুর জেলার পুলিশ সুপার। ২০১৮ সালের ৭ জুন পুলিশ সুপার হিসেবে তার যোগদানের পর খোলনলচে পাল্টে যায় জেলার পুলিশ পুলিশিং। ময়মনসিংহ রেঞ্জে চারবারের শ্রেষ্ঠ পুলিশ সুপারের পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তার বিভিন্ন পদক্ষেপ সাড়া ফেলে শেরপুরে।

সর্বশেষ তার নেতৃত্বে অসহায় কৃষকদের পাশে দাঁড়ায় শেরপুর জেলা পুলিশ। ধান কাটার উৎসবের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা মাঠের ফসল তুলে দেন কৃষকের গোলায়।

পাশাপাশি জেলার করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের বাড়িতেও ফলসহ খাবার সামগ্রী পৌঁছে দেন তিনি। সচেতনতার অংশ হিসেবে চালকদের মাস্ক ব্যবহার ছাড়া পেট্রোলপাম্প থেকে কোন যানবাহনে জ্বালানি না দেওয়ারও অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেন তিনি।

গত রোববার ফুলেল শুভেচ্ছায় পুলিশ সুপার বরণ করে নেন করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে সুস্থ হয়ে ফিরে আসা দুই পুলিশ কর্মকর্তা এসআই সাইদুর রহমান খান ও তোফায়েল হোসেনকে।

সম্মুখ সমরে বিজয় ‘বীর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বাহিনীর অন্য সদস্যদের কাছে তাদের তুলে ধরেছেন অনন্য উচ্চতায়। বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে। কিভাবে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামিল হতে হবে, ভয় না পেয়ে করোনাকে জয় করতে হবে- সেই বার্তাই পৌঁছে দিয়েছেন বাহিনীর সদস্যদের কাছে।

প্রাণঘাতী মহামারি করোনাভাইরাস সঙ্গে জীবন মৃত্যুর লড়াই করে জীবন হাতে নিয়ে ফিরে আসা জেলা পুলিশের দুই কর্মকর্তার মুখে পুলিশ সুপারের অনন্য মানবতার গল্প শুনে এখন উজ্জীবিত বাহিনী অন্য সদস্যরাও। জেলা পুলিশ সুপারের সেই মানবিক গুণাবলির কথাই এখন ঘুরে ফিরছে এই মুখ থেকে ও মুখে।

করোনাজয়ী শেরপুর পুলিশের উপ-পরিদর্শক সাইদুর রহমান খান জানান, নির্জন আইসোলেশন ওয়ার্ডে প্রথমদিকে সর্বক্ষণ তাড়া করত মৃত্যু ভয়। পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা হল দুর্ধর্ষ কোন খুনির চাইতেও যেন ভয়ংকর করোনাভাইরাস। কারণ আপনি অস্ত্র দিয়ে খুনিকে মোকাবিলা করতে পারবেন। কিন্তু সময়মতো মানসিক সমর্থন শক্তি আর সাহস ছাড়া এই রোগকে প্রতিহত করা সম্ভব না।

পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম স্যার আমাকে সব সময় মানসিক সাহস জুগিয়ে গেছেন। সেটা না পেলে হয়তো আমি হেরেই যেতাম। ঢোলে পড়তাম মৃত্যুর কোলে। অন্য ৫ শহীদ পুলিশ সদস্যের সঙ্গেও আমার নাম যোগ হতো।

স্যার এটা হতে দেননি। কখনো মনে হয়নি তিনি আমাদের পুলিশ সুপার। মনে হয়েছে চিকিৎসক কিংবা মনোবিদ। কখনো বা ঘনিষ্ঠ স্বজন বা বন্ধুর মত পাশে থেকে আমাদের সাহস দিয়েছেন। চাকরি জীবনের ২৯ বছরে এমন এসপি আমার জীবনে প্রথম দেখলাম। বলছিলেন, এসআই সাইদুর রহমান খান।

সুস্থ হয়ে আসা আরেক এসআই তোফায়েল হোসেন জানান, এসপি স্যার যেভাবে আমাকে গভীর রাতেও কাউন্সিলিং করেছেন, সহমর্মিতা জানিয়েছেন, আমার পরিবারের স্বজনদের খোঁজখবর নিয়েছেন – সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ ও অভিভূত। বলতে পারেন, ভয়ঙ্কর করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শক্তির উৎসই ছিলেন কাজী আশরাফুল আজীম স্যার।

করোনা ভাইরাসে শেরপুরে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ জন। যাদের তিনজনই পুলিশ সদস্য। দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৪ জন। চিকিৎসাধীন অন্য আরেক পুলিশ সদস্য দ্রুত সেরে উঠছেন।

যোগাযোগ করা হলে কাজী আশরাফুল আজীম জানান, করোনা ভাইরাসে ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা হিসেবে প্রায় এক হাজার পুলিশসদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন পাঁচজন।শুরু থেকেই আমি এই বার্তাটা আমার সহকর্মীদের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে, একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যদি আমরা কেউ বিপদগ্রস্ত বিশেষ করে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হই তাহলে আমরা সবাই পরস্পরের পাশে থাকবো। প্রধানমন্ত্রী এবং পুলিশের আইজিপি আমাদের যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেগুলো আমরা প্রতিপালন করার চেষ্টা করেছি। বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে যাতে মনোবল অটুট থাকে। সবাই মিলে যাতে এই যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারি- সব সময় সেই চেষ্টাটাই করেছি। যোগ করেন পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম।