৬ মে ঐতিহাসিক বালাকোট দিবস

৬ মে ঐতিহাসিক বালাকোট দিবস
  • 1
    Share

বালাকোটের ময়দানে যারা শাহাদাৎ বরণ করেছেন তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাদেরকে শহীদ হিসেবে কবুল করে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন, আমীন।

১৮৩০ সালের এই দিনে বালাকোটের ময়দানে এক অসম যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেরলভি (রহ.) ও তাঁর সহযোদ্ধারা। ভারতীয় উপমহাদেশে তৎকালীন মুসলমানদের প্রাণ পুরুষ ছিলেন শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেরলভি (রহ.)। আজও তিনি অত্যন্ত সম্মানের পাত্র হয়ে আছেন। সেই সাথে ৬ মে স্বাধীনতা প্রিয় মুসলমানদের নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিন। বালাকোটের শহীদদের প্রেরণায় ভারতে মুসলমানগণ আজাদী আন্দোলনের মাধ্যমে পৃথক আবাসভূমি লাভে উজ্জীবিত হয়েছিলেন।

সারা উপমহাদেশ থেকে উৎসাহী যুবক ও ইসলামী চিন্তাবিদদের নিয়ে মুজাহিদ বাহিনী গঠন করেন। তার নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামী মুজাহিদগণ ভারতের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রসিদ্ধ নগরী পেশোয়ার দখল করে শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেরলভি (র.) সেখানেই প্রধান কর্মকেন্দ্র স্থাপন করেন।

সৈয়দ আহমদের বাহিনীর সাথে কয়েকটি যুদ্ধে শিখ ও ব্রিটিশ বাহিনী পরাজিত হয়। সারা ভারতের মুসলমানদের নিকট শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেরলভি (র.) অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। সম্মুখ সমরে মুজাহিদ বাহিনীর সাথে টিকে উঠা সম্ভব নয় এ ভেবে বৃটিশ ও শিখ নরপতিগণ কূটকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করলো।

৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের সফল সিন্ধু অভিযানের মধ্য দিয়ে ভারত উপমহাদেশে মুসলমানগণের আনুষ্ঠানিক আগমন ঘটে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের আগমনের পূর্বে খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে পারস্য ও মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান, খোরাসান, তাজাকিস্তানসহ আফগানিস্তানে মুসলিম অধিকার বিস্তৃত হয়ে তৌহিদী ঝাণ্ডা চীনের প্রাচীরের দিকে ধাবিত হয়।

মহানবী (সা.)-এর মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র অর্ধশতাব্দীর মধ্যেই অর্ধ পৃথিবীব্যাপী ইসলাম নামক শান্তি ও সভ্যতার মহা প্লাবন বাঁধভাঙ্গা বন্যার মত বিস্তার লাভ করে। ইসলামের এই দাওয়াতী অভিযান এই উপমহাদেশের দ্বারপ্রান্তে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর আফগান শাসক সুলতান মাহমুদ বারংবার ভারত আক্রমণ করে উপমহাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করেন।

সুলতান মাহমুদের পর মুহাম্মদ ঘোরী দিল্লীতে মুসলিম সম্রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করে ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। যা হোক মুহাম্মদ বিন কাসিম থেকে নবাব সিরাজদ্দৌলা পর্যন্ত প্রায় এক হাজার বছর মুসলমানগণ এই উপমহাদেশে শাসন কার্য চালিয়েছেন।

পরবর্তীতে মুসলিম শাসক ও সমরবিদগণ নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে বিলাসিতা, ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য আত্মকলহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ সুযোগে ইউরোপের উদীয়মান শক্তি ইংরেজ ও ফরাসীগণ ভারতে তাদের সম্রাজ্যবিস্তারের প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করে।

উপমহাদেশের বিচ্ছিন্ন মুসলিম শক্তি এই বিদেশি বেনিয়াদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হবার পরিবর্তে এক মুসলমান অন্য মুসলমান ভাইয়ের ক্ষমতা খর্ব করার লক্ষ্যে বিদেশিদের সাহায্য কামনা করতে থাকে। ভারতের অমুসলিম বিশেষ করে রাজপুত, মারাঠা ও শিখগণ এদেশ থেকে মুসলমানদের বিতাড়ণের মোক্ষম সুযোগ বুঝে ইউরোপীয় শক্তিকে সর্বাত্মক সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করে। ১৭৫৭ সালে ইংরেজগণ বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে শঠতার মাধ্যমে পরাজিত করে বাংলাসহ ধীরে ধীরে গোটা উপমহাদেশ তারা পদানত করে।

মুসলমানগণের এই দুর্দিনে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (র.) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে মুসলিম জাগরণের লক্ষ্যে সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র.)-এর দিক নির্দেশনামূলক শিক্ষা আন্দোলন সচেতন মুসলিম সমাজে নবজাগরণের বাতাস বইতে শুরু করে।

শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী (র.)-এর ইন্তেকালের পর তার চারজন সুযোগ্যপুত্র ও বহু সংখ্যক শাগরেদ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী (র.)-এর জ্যেষ্ঠপুত্র শাহ আব্দুল আযীয (র.) ছিলেন পিতার যোগ্য উত্তরসূরী। তার বহুসংখ্যক শিষ্য পবিত্র কুরআন, হাদীস, ফিকাহ শাস্ত্রসহ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে পরাধীনতার করালগ্রাস থেকে মুসলিম জাতিকে মুক্ত করে শরীয়তের মূলভিত্তির ওপর দেশ পরিচালনার প্রেরণায় উজ্জীবিত হন।

এসব মনীষীদের মধ্যে শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেরলভি ও শাহ মুহাম্মদ ইসমাঈল (র.) ছিলেন অন্যতম। শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেরলভি (র.) ভারতকে ইসলামী হুকুমতের নিয়ন্ত্রণে আনায়নের লক্ষ্যে ইসলামবিরোধী ও ইউরোপীয় সম্রাজ্যবাদীদের কবল থেকে উদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছিলেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে সমগ্র ভারতব্যাপী প্রচারণা চলতে থাকে।

শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেরলভির (র.) জ্বালাময়ী বক্তৃতায় মুসলমানদের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্খা জাগ্রত হতে থাকে। তার সংগ্রামী প্রচারণার কঠিন কষাঘাতে মুসলিম জাতি অলসতার শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াতে থাকে।

প্রচার ও সাংগঠনিক কাজের সুবিধার্থে শাহ সৈয়দ (র.) গোটা ভারতকে চারটি ভাগে বিভক্ত করে পৃথক পৃথক দায়িত্বশীল নিয়োগ করেন। শাহ সৈয়দ ব্রেরলভি (র.) জিহাদ আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্বে বহু সংখ্যক শিষ্যসহ মক্কায় হজ্ব ও ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে গমন করেন। ঐ সময় আরব উপদ্বীপে মুহম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব নজদীর নেতৃত্বে শিরক ও বিদআত বিরোধী এক দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।

ঐ আন্দোলন মূলত ছিল বিজাতীয় সংস্কৃতি থেকে মুসলমানদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির এক আপোষহীন সংগ্রাম যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহকে ঔপনিবেশিক ইউরোপীয় বেনিয়াদের হাত থেকে মুক্তি অর্জনের পথ প্রশস্ত করে। শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেরলভি (র.) ঐ সংস্কার আন্দোলনের সংস্পর্শে এসে ইসলামের কালজয়ী আদর্শের প্রতি আরো অধিক অনুরক্ত হয়ে ওঠে এবং মুক্তি সংগ্রামের তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে ভারতবর্ষে পদার্পণ করেন।

ঐ সময়ই বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের সংগ্রামী নেতা হাজী নিসার আলী ওরফে তিতুমীরের সাথে শাহ সৈয়দ (র.)-এর পরিচয় ঘটে এবং এই দুই স্বাধীনতা সংগ্রামী অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনার প্রেরণা নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেরলভি (র.) স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ অনুকরণ।